পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা - পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন | Poribesh Songrokhone Bonayon Rochona

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা - পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন,  Poribesh Songrokhone Bonayon Rochona, পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন বলতে কি বোঝায়, পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন অনুচ্ছেদ রচনা, রচনা - পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

    পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা

    ভূমিকা : 

    “ অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান । প্রাণের প্রথম জাগরণে তুমি , বৃক্ষ , আদিপ্রাণ । ঊর্ধ্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলােকের প্রথম বন্দনা , ছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ পরে আনিলে বেদনা নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে । ”

    সভ্যতার আদি যুগে মানুষ একদিন অরণ্য প্রকৃতির নিবিড় ছায়ায় সহস্র বিটপীর স্নিগ্ধ সান্নিধ্যে জীবন অতিবাহিত করেছে । কিন্তু সভ্যতা যতই সম্প্রসারিত হয়েছে মানুষ ততই প্রকৃতির জগৎ থেকে নির্বাসিত হয়েছে । মানুষ নিজ হাতে নির্মূল করেছে তার শৈশব সভ্যতার সঙ্গী তরুরাজিকে । সভ্যতা যেমন আমাদের দিয়েছে প্রচুর তেমনি কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু । বৃক্ষের সঙ্গে আমরা আজ আত্মীয়তা হারিয়ে ফেলতে চলেছি অথচ এই বৃক্ষই আমাদের প্রাণের উৎস । বৃক্ষরােপণ তথা বনায়ন শুধু প্রকৃতিকে ভালােবাসার স্মারক নয় , এ হল মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার এক মহৎ প্রয়াস ।

    বনায়ন ও পরিবেশ : সভ্যতার আদিকাল থেকেই মানুষ গাছপালা ও তৃণলতার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে । এ বৃক্ষলতাই মানুষের খাদ্য বস্ত্র ও বাসস্থান যুগিয়েছে । জীবন ও প্রকৃতির অস্তিত্ব টিকে আছে বৃক্ষের ওপর । আগে এই বৃক্ষরাজি মানুষকে প্রাকৃতিকভাবেই বেষ্টন করে রাখত কিন্তু বৃক্ষনিধন করে আজ পৃথিবী এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে মানুষকেই বৃক্ষরােপণ করতে হচ্ছে । আর এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় বনায়ন । জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে বর্তমানে এর কোনাে বিকল্প নেই । বনায়ন আর সুস্থ - সুন্দর পরিবেশ দুটি শব্দ যেন পরস্পরের সাথে ওতপ্রােতভাবে জড়িত । বনায়ন ছাড়া পরিবেশের অস্তিত্ব ও সৌন্দর্য কল্পনাই করা যায় না । 

    পরিবেশ বিপর্যয়ে বর্তমান বিশ্ব : বর্তমান সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি , কল কারখানার প্রসার , রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়তা ও বনজ সম্পদ নিঃশেষ করার জন্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে । এ পরিবেশ বিপর্যয়কে বিজ্ঞানীগণ গ্রীন হাউস ইফেক্ট গ্রীন হাউস প্রতিক্রিয়া নামে চিহ্নিত করেছেন । এই প্রতিক্রিয়ার দরুণ সূর্যের তেজস্ক্রিয় রশ্মিগুলাে সরাসরি পৃথিবীতে আসছে । অকাল বন্যা , অনাবৃষ্টি , অতিবৃষ্টি , ঘূর্ণিঝড় , জলােচ্ছ্বাস , তুষারপাত , ভূমিধ্বস , প্রভৃতির মতাে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে । এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় রােধকল্পে যে সমস্ত কর্মসূচি নেওয়া প্রয়ােজন তাদের মধ্যে বনায়ন অন্যতম । আধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেছেন যে , পানি এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সম্পর্ক রয়েছে যাকে ইকোসিস্টেম বলে । এর ব্যতিক্রম ঘটলে শুধু প্রকৃতি নয় , গােটা পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় । আর বর্তমান বিশ্ব সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ারই শিকার । 

    বাংলাদেশের বনভূমি : আমাদের দেশে একসময় যথেষ্ট বন - বনানী ছিল । কিন্তু কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে । অধিক জনসংখ্যার চাপে এবং বসতবাড়ি তৈরির প্রয়ােজনে বন কাটা হচ্ছে । ফলে বর্তমানে আমাদের দেশের প্রয়ােজনের তুলনায় যে পরিমাণ বনভূমি থাকা প্রয়ােজন তা নেই । একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মােট ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়ােজন । কিন্তু সেখানে আমাদের দেশে মােট ১৬ শতাংশ বনভূমি রয়েছে । বিশ্ববিখ্যাত সুন্দরবন , ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় , চট্টগ্রাম , পাবর্ত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনভূমি আমাদের দেশের এক বিশাল সম্পদ । তবে বর্তমানে আমাদের যে পরিমাণ বনভূমি রয়েছে তা যদি আর ধ্বংস না করা হয় , তবে তা প্রয়ােজনীয় বনভূমিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না । 

    বাংলাদেশে বনায়নের গুরুত্ব ও প্রয়ােজনীয়তা : মানুষ আজ অরণ্য বিনাশের মাধ্যমে পৃথিবীতে আহ্বান করে আনছে মরুভূমি । অরণ্যই মরুভূমিকে প্রতিরােধ করতে পারে , অরণ্যই মরুভূমিকে শ্যামল - স্নিগ্ধ , স্নেহময়ী জননীর মূর্তি দান করতে পারে । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নাগরিক সভ্যতার ইট , কাঠ , পাথরের কৃত্রিমতায় ক্লান্ত হয়ে আবেগকম্পিত কণ্ঠে প্রার্থনা করেন 

    “ দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর নাও যত লৌহ , লােষ্ট্র , কাঠ ও প্রস্তর হে নব সভ্যতা , হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী দাও ফিরে তপােবন , পুণ্যচ্ছায়া রাশি , গ্লানিহীন অতীতের দিনগুলাে । " 

    উন্নয়নশীল বিশ্বের শতকরা তিন ভাগ ইন্টারনাল রিটার্ন ও শতকরা ৭০ ভাগ জ্বালানি শক্তির জন্য বৃক্ষ বা কাঠের ওপর নির্ভরশীল এবং এ চাহিদা পূরণের জন্য কোনাে দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনজসম্পদ । অত্যাবশ্যকীয় । অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসম্পদের পরিমাণ মােট ভূ - ভাগের ৯.৩ শতাংশ এবং বনবিভাগের মতে ০.০৯ শতাংশ , যা জনবহুল বাংলাদেশের জন্য মােটেও পর্যাপ্ত নয় । বাংলাদেশের মাথাপিছু কাঠ ব্যবহারের ২.৬৮ ঘনফুট । কিন্তু বর্তমানে কাঠের চাহিদার মাত্র ৪৮.৫ শতাংশ নিজৰ বনভূমি থেকে পূরণ করা সম্ভব ।

    পরিবেশ রক্ষায় বনায়ন : প্রখ্যাত পরিবেশবিজ্ঞানী মাইকেল মালিকফার ইস্টার্ন রিভিউতে একটি মানচিত্রের সাহায্যে দেখিয়েছেন যে আগামী শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক - দশমাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে । সাম্প্রতিককালে একজন খ্যাতনামা পরিবেশবিজ্ঞানীর ভাষ্য , ক্রমাগত বৃক্ষ নিধনের ফলে ২০৩০ সালে এদেশের ৮০ ° থেকে ১০ ° সে . তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে । আমাদের গড় তাপমাত্রা ৩৫ ° -৩৬ ° সে . বেড়ে ৪৫ ° -এ দাঁড়াবে । কাজেই আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়নের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরােপ করা উচিত । বাংলাদেশের নামের সাথে যে সুজলা - সুফলা , শস্য - শ্যামলা বা রূপসী বাংলা নাম জড়িয়ে আছে সে নামটিই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না যদি আমরা পরিবেশ সংরক্ষণে বা বনায়নে উদ্যোগী না হই । পরিবেশ বিপর্যয় রােধে তাই বনায়নের কোনাে বিকল্প আমাদের কাছে নেই । 

    বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি : বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন গ্রামীণ জনপদে আর্থ - সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমােচনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে । সে সাথে সামাজিক বনায়ন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা , জলবায়ু পরিবর্তন উপশম ও অভিযােজনে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে । বনবিভাগ ষাটের দশকের শুরুর দিকে বন - সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে সর্বপ্রথম বনায়ন কর্মসূচি জনগণের কাছে নিয়ে । যায় । ২০০০ সালে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমকে ১৯২৭ সালের বন আইনে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আইনি কাঠামােতে নিয়ে আসে । সামাজিক বনায়নকে আরও শক্তিশালী করার জন্য ২০০৪ সালে সরকার বিধিমালা প্রণয়ন করে এবং ২০১০ সালে সংশােধনী আনা হয় । বনবিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়িত সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের আওতায় এ যাবৎ প্রায় ৪৪৪০৮ হেক্টর উডলট বাগান , ১০৬২৬ হেক্টর কৃষি বাগান , ৬১৭৩৯ কিলােমিটার স্ট্রিপ সৃজন করা হয়েছে । এছাড়া বিগত ৪ বছরে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড আওতাভুক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী , স্বল্পমেয়াদী ও নন । ম্যানগ্রোভ ২১৫৫ হেক্টর ব্লক বনায়ন এবং সড়ক রেলপথ ও বাঁধ সংযােগ সড়কে ২৬৪১ কি.মি. স্ট্রিপ বনায়ন । করা হয়েছে । সৃজিত বাগানে প্রায় ৫ লক্ষ উপকারভােগী সম্পৃক্ত আছে । সারাদেশে ব্যাপক বনায়নের লক্ষ্যে প্রায় ৪ কোটি ৮৮ লক্ষ ৬৩ হাজার চারা বিক্রয় ও বিতরণ করা হয়েছে । সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সরকারি রাজস্ব হয়েছে ২০৫ কোটি ৩৭ লক্ষ ৮৪ হাজার ৮ শত ৭০ টাকা । 

    উপসংহার : দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য বৃক্ষরােপণ অভিযান একটি বিরাট পদক্ষেপ । বৃক্ষরােপণ অভিযান । তথা বনায়ন সফল হলে দেশের হৃত গৌরবকে শস্য - শ্যামলিমার দেশ এই বাংলাকে আবার চিরসবুজ শ্যামল । করা যাবে । তাই আমরা বনায়ন অভিযানের মাধ্যমে লাগাব বৃক্ষ - তাড়াব দুঃখ- দেশকে করব সমৃদ্ধ ।

    পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

    Poribesh Songrokhone Bonayon Rochona


    Tag: পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন রচনা - পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন,  Poribesh Songrokhone Bonayon Rochona, পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন বলতে কি বোঝায়, পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন অনুচ্ছেদ রচনা, রচনা - পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

    Previous Post Next Post

    👇 সকল ক্লাসের এসাইনমেন্ট নোটিফিকেশন আকারে সহজে পেতে ডাউনলোড করুন আমাদের এপ্লিকেশন 

    আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত হতে ক্লিক করুন