তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার বিধান | ডিভোর্সের পর বিয়ে - কোরআন হাদিস অনুযায়ী

তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার বিধান | ডিভোর্সের পর বিয়ে - কোরআন হাদিস অনুযায়ী


আসছালামু আলাইকুম সম্মানিত পাঠকবৃন্দ আসা করি সবাই আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন। আমরা ও আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসায় ভালো আছি। প্রিয় পাঠক আজকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ একটি টপিক নিয়ে আলোচনা করবো সেটা হলো তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার বিধান -ডিভোর্সের পর বিয়ে ইসলামিক দৃষ্টিকে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

প্রিয় দ্বীনি ভাইয়েরা তালাক  ইসলামের এবং মানব জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্ঠতম হালাল কাজ। আল্লাহর কাছে সব চেয়ে অপ্রিয় হালাল হচ্ছে তালাক। এই তালাক সম্পর্কে আমরা নানা ভূল ভ্রান্তিতে এখন আছি। অনেক মাসআলা না জানার কারনে অনেক ভূল করে আসতেছি। সংসারে নানান সমস্যা হয় এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আমরা তালাক দিয়ে থাকি। অনেকে আছেন যারা তিন তালাক দেওয়ার পর স্ত্রীকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে চান। ইসলামের দৃষ্টিকে তিন তালাকের পর পুনরায় ফিরিয়ে আনার বিধান কি আসুন জেনে নেই।

   
       

    তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার বিধান

    তালাক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কেউ এই ক্ষমতার অপব্যবহার করলে কিংবা ভুল পন্থায় তা প্রয়োগ করলে সে একদিকে যেমন গুনাহগার হবে অন্যদিকে তালাকও কার্যকর হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি বিবেচক স্বামীর দায়িত্ব হল, তালাকের শব্দ কিংবা এর সমার্থক কোনো শব্দ মুখে উচ্চারণ করা থেকে সতর্কতার সাথে বিরত থাকা।

    অবশ্য অতীব প্রয়োজনে তালাক প্রদানে বাধ্য হলে স্ত্রীর পবিত্র অবস্থায় শুধু এক তালাক দিয়ে ক্ষান্ত হওয়া উচিত। এভাবে বলবে যে, ‘তোমাকে তালাক দিলাম।’ তালাকের সাথে ‘বায়েন’ শব্দ কিংবা ৩ সংখ্যা ব্যবহার করবে না। কেউ ‘বায়েন’ শব্দ বলে ফেললে (চাই তা এক বা দুই তালাক হোক না কেন) নতুন করে শরীয়তসম্মত পন্থায় বিবাহ দোহরানো ছাড়া স্ত্রীর সাথে পুনরায় মিলনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

    অনুরূপভাবে তিন তালাক দিয়ে ফেললে-একই মজলিসে পৃথক পৃথকভাবে তিন তালাক দেওয়া হোক কিংবা একই শব্দে তিন তালাক দেওয়া হোক- যেমন বলল, তোমাকে তিন তালাক দিলাম। অথবা আগে কখনো দুই তালাক দিয়েছিল আর এখন শুধু এক তালাক দিল। সর্বমোট তিন তালাক দেওয়া হল। যেকোনো উপায়ে তিন তালাক দেওয়া হলে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় শুধু মৌখিকভাবে স্ত্রীকে বিবাহে ফিরিয়ে আনার যেমন কোনো সুযোগ থাকে না তেমনি নতুন করে বিবাহ দোহরানোর মাধ্যমেও ফিরিয়ে নেওয়ার পথ খোলা থাকে না।

    একসাথে তিন তালাক দেওয়া কিংবা বিভিন্ন সময় তালাক দিতে দিতে তিন পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একটি জঘণ্য অপরাধ ও ঘৃণিত কাজ। আল্লাহ তাআলা এর শাস্তি হিসেবে এই বিধান দিয়েছেন যে, তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পুনরায় একসাথে বসবাস করতে চাইলে স্ত্রীর ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর অন্যত্র তার বিয়ে হওয়া এবং সে স্বামীর সাথে তার মিলন হওয়া অপরিহার্য। এরপর কোনো কারণে সে তালাকপ্রাপ্তা হলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলে ইদ্দত পালনের পর এরা দুজন পরস্পর সম্মত হলে নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। 

    এজন্য শরীয়ত আগেই সাবধান করে দিয়েছে যে, প্রথমত তালাকের কথা

    চিন্তাও করবে না। তবে অতীব প্রয়োজনে কখনো তালাক প্রদানের প্রয়োজন হলে শুধু সাদামাটা তালাক দাও, শুধু এক তালাক। যেন উভয়ের জন্যই নতুন করে চিন্তা-ভাবনার সুযোগ থাকে এবং পুনরায় ফিরে আসার পথ খোলা থাকে। এরপর আবারো কোনো সমস্যা দেখা দিলে এভাবেই শুধু এক তালাক দিবে। এখনও ফিরে আসার পথ খোলা থাকবে।

    কিন্তু এরপর যদি আবার কখনো শুধু এক তালাকই দেওয়া হয় এবং সব মিলে তিন তালাক হয়ে যায় এ অবস্থায় আর তাকে ফিরিয়ে আনারও সুযোগ থাকবে না, নতুন করে বিয়ে করার বৈধতাও বাকি থাকবে না।

    আজকাল স্বামী-স্ত্রী তালাকের বিধান জানা ও সে অনুযায়ী আমল করার পরিবর্তে নিজেদের মনে এমনসব ভুল ও বানোয়াট মাসআলা স্থির করে রাখে যে, আল্লাহ মাফ করুন।

    ডিভোর্সের পর বিয়ে- কোরআন হাদিস অনুযায়ী

    স্ত্রীকে তিন তালাক দেবার পর আবার তাকে বিয়ে করা যায় না কেন? এটা কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ। আল্লাহর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ।

    তাই স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেবার পর উক্ত স্ত্রীর সাথে ঘর সংসার করার কোন সুযোগ নেই।

    প্রতিটি মুমিন মুসলমান আল্লাহর ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিদের্শ মানতে বাধ্য।

    فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٢:٢٣٠]

    তারপর যদি সে স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়,তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিয়ে করে না নেবে,তার জন্য হালাল নয়। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়,তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা; যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। {সূরা বাকারা-২৩০}

    وقال الليث عن نافع كان ابن عمر إذا سئل عمن طلق ثلاثا قال لو طلقت مرة أو مرتين فأن النبي صلى الله عليه و سلم أمرني بهذا فإن طلقتها ثلاثا حرمت حتى تنكح زوجا غيرك

    হযরত নাফে রহ. বলেন,যখন হযরত ইবনে উমর রাঃ এর কাছে ‘এক সাথে তিন তালাক দিলে ‎তিন তালাক পতিত হওয়া না হওয়া’ (রুজু‘করা যাবে কিনা) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো,‎তখন তিনি বলেন-“যদি তুমি এক বা দুই তালাক দিয়ে থাকো তাহলে ‘রুজু’ [তথা স্ত্রীকে বিবাহ করা ছাড়াই ফিরিয়ে আনা] করতে পার। ‎কারণ,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকম অবস্থায় ‘রুজু’ করার আদেশ দিয়েছিলেন। ‎যদি তিন তালাক দিয়ে দাও তাহলে স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে, সে তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামী গ্রহণ করা পর্যন্ত। {সহীহ বুখারী-২/৭৯২, ২/৮০৩}

    ২। এতই যখন চিনে। তাহলে তালাক দিলো কেন? শরীয়তে স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে তালাকের বিধানই রাখা হয়েছে যদি উভয়ের মাঝে সম্পর্ক রাখা সম্ভবপর না হয়, তখন যেন তালাকের মাধ্যমে উভয়ে উভয় থেকে মুক্ত হতে পারে।

    তারপরও শরীয়ত  তিন তালাক দিতে বলে না। বরং এক তালাক দিতে বলে। যাতে করে পরবর্তীতে ভুল শুধরে গেলে ফিরে আসার  সুযোগ থাকে।

    আপনি শরীয়তের আইন লঙ্ঘণ করে তিন তালাক দিয়ে আবার শরীয়তের উপরই দোষ চাপাতে পারেন না। শরীয়ততো আপনাকে তিন তালাক দিতে বলেনি। তিন তালাক একসাথে দেয়াকে বিদয়ী তালাক বা নাজায়েজ তালাক বলে অভিহিত  করেছে।

    আপনি যখন শরীয়তের আইন লঙ্ঘণ করলেন, তখন শাস্তি হিসেবে আইন করা হয়েছে যে, উক্ত  স্বামীর কাছে স্ত্রী আর আসতে পারবে না। শাস্তি স্বরূপ তারই স্ত্রী অন্য ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। তারপর যদি দ্বিতীয় স্বামী মারা যায়, কিংবা কোন কারণে তালাক দেয়, তাহলেই কেবল প্রথম স্বামী আবার বিয়ে করতে পারবে।

    এটা শরীয়তের আইন লঙ্ঘণকারী স্বামীর জন্য একটি শাস্তি। তার নিজের  স্ত্রী অন্য ব্যক্তির সাথে শারিরীক সম্পর্কে জড়াবে। একজন স্বামীর জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?

    সহজ কথায় শরীয়ত লঙ্ঘণকারী স্বামীর জন্য শাস্তিস্বরূপ এ বিধান রাখা হয়েছে।

    তিন তালাকের পর পুনরায় বিয়ের বিধান 

    স্বামী যদি স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দেয়ার পর পুনরায় সে স্ত্রীকে বিয়ে করার কামনা করে; তবে করণীয় কী? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর স্বামী যদি স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দেয় তবে অন্য লোকের সাথে বিবাহ দেয়া ব্যতিত সেই স্ত্রী (প্রথম) স্বামীর জন্য হালাল নয়।

    পরে যখন (দ্বিতীয় স্বামী সহবাসের পর) স্ত্রীকে তালাক দেয়, তখন তারা যদি এ ধারণা করে যে, আল্লাহ পাকের সীমার ভেতর থাকতে পারবে অর্থাৎ আল্লাহর বিধি-বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপন করতে পারবে) তবে উভয়ে পুনঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাদের জন্য কোনো গোনাহ নেই। এ সব আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমা।

    কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দেয়ার পর তাকে পুনরায় বরণ করে নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। তবে তার জন্য একমাত্র বৈধ ব্যবস্থা হলো ‘হালালাহ’ করা। অর্থাৎ অন্য স্বামীর নিকট নিয়মিত বিবাহ দেয়া এবং তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠা।

    অতঃপর তাদের মাঝে সংসার জীবনে কোনো কারণে যদি ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়; তবে ইদ্দত পালনের পর ওই স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে।

    মনে রাখতে হবে-
    প্রথম স্বামীর বিবাহের উদ্দেশ্যে কোথাও স্ত্রীকে বিয়ে দিয়ে তালাকের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি পরিকল্পনামাফিক বিয়ে এবং তালাক সম্পাদন করা ‘হালালাহ’-এর অন্তর্ভূক্ত নয়।

    আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম রাজি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘তিন তালাকের পরও যদি স্ত্রী স্বামীর নিকট গমন করতে ইচ্ছুক হয় তবে পাঁচটি কাজ অবশ্যই সম্পাদন করতে হবে। আর তা হলো-

    >> তিন মাস ইদ্দত অতিবাহিত করতে হবে;

    >> দ্বিতীয় স্বামীর সাথে বিবাহ হতে হবে;

    >> দ্বিতীয় স্বামীর সাথে শুধু নামে মাত্র বিবাহ হলে চলবে না, বরং তার সাথে যথারীতি সহবাস করতে হবে;

    >> দ্বিতীয় স্বামী কর্তৃক তাকে তালাকপ্রাপ্ত হতে হবে এবং এ তালাকের জন্য পুনরায় তিন মাস ইদ্দত পালন করতে হবে।

    >> পুনরায় প্রথম স্বামীর সাথে নিয়মিতভাবে বিবাহ হতে হবে।


    নোটঃ- এই আর্টিকেলটি আল কাওছার ও আহলে হক মিডিয়া থেকে সংগ্রহীত।

    Tag: তিন তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার বিধান,  ডিভোর্সের পর বিয়ে

                                   
    Previous Post Next Post

      আপনার নামের অর্থ জানতে ক্লিক করুন


    আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত হতে ক্লিক করুন