বাংলা কবিতা স্টাটাস | বাংলা কবিতার লাইন | বাংলা কবিতা সমূহ | বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |বাংলা কবিতা pdf

আসসালামু আলাইকুম, বন্ধুরা সবাই কেমন আছেন? আশা করি সবাই ভাল আছেন। স্কুল কলেজে পড়েন এমন কেউ নাই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়েন নাই।আজ উনার কবিতা সবাই পছন্দ করেন। তাই আজকে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু কবিতা নিয়ে তোমাদের মাঝে হাজির হলাম এবং এরপর তোমাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে ফেমাস একটি কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি pdf তোমাদের মধ্যে।শেয়ার করবো এর লিংক মধ্যখানে পেয়ে যাবেন।
   
       

    বাংলা কবিতা স্টাটাস | বাংলা কবিতার লাইন | বাংলা কবিতা সমূহ | বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |বাংলা কবিতা pdf


    বাংলা কবিতা স্টাটাস | বাংলা কবিতার লাইন | বাংলা কবিতা সমূহ | বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |বাংলা কবিতা pdf

    বাংলা কবিতা স্টাটাসবাংলা কবিতার লাইন এবং বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কিছু কবিতা নিচে দেওয়া হলো। আসা করি তোমাদের ভালো লাগবে।

    বাংলা কবিতা স্টাটাস | বাংলা কবিতার লাইন | বাংলা কবিতা সমূহ | বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |বাংলা কবিতা pdf

    অনন্ত প্রেম

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি
     শত রূপে শত বার
     জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।
     চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়
     গাঁথিয়াছে গীতহার,
     কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,
     নিয়েছ সে উপহার
     জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।

     যত শুনি সেই অতীত কাহিনী,
     প্রাচীন প্রেমের ব্যথা,
     অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা,
     অসীম অতীতে চাহিতে চাহিতে
     দেখা দেয় অবশেষে
     কালের তিমিররজনী ভেদিয়া
     তোমারি মুরতি এসে,
     চিরস্মৃতিময়ী ধ্রুবতারকার বেশে।

     আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
     যুগল প্রেমের স্রোতে
     অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
     আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
     কোটি প্রেমিকের মাঝে
     বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
     মিলনমধুর লাজে—
     পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।

     আজি সেই চিরদিবসের প্রেম
     অবসান লভিয়াছে
     রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে।
     নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ,
     নিখিল প্রাণের প্রীতি,
     একটি প্রেমের মাঝারে মিশেছে
     সকল প্রেমের স্মৃতি—
     সকল কালের সকল কবির গীতি।

    ======

    আমার মাঝে তোমার লীলা হবে

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    আমার মাঝে তোমার লীলা হবে,  
     তাই তো আমি এসেছি এই ভবে।  
     এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার,  
     ঘুচে যাবে সকল অহংকার,  
     আনন্দময় তোমার এ সংসার  
     আমার কিছু আর বাকি না রবে।  
      
     মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে  
     আমার মাঝে তোমার লীলা হবে।  
     সব বাসনা যাবে আমার থেমে  
     মিলে গিয়ে তোমারি এক প্রেমে,  
     দুঃখসুখের বিচিত্র জীবনে  
     তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে। 
      
    ====== 

    আছল স্মৃতি

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

    আমার হৃদয়ভূমি-মাঝখানে  
     জাগিয়া রয়েছে নিতি  
     অচল ধবল শৈল-সমান  
     একটি অচল স্মৃতি।  
     প্রতিদিন ঘিরি ঘিরি  
     সে নীরব হিমগিরি  
     আমার দিবস আমার রজনী  
     আসিছে যেতেছে ফিরি।  
      
     যেখানে চরণ রেখেছে সে মোর  
     মর্ম গভীরতম—  
     উন্নত শির রয়েছে তুলিয়া  
     সকল উচ্চে মম।  
     মোর কল্পনা শত  
     রঙিন মেঘের মতো  
     তাহারে ঘেরিয়া হাসিছে কাঁদিছে,  
     সোহাগে হতেছে নত।  
      
     আমার শ্যামল তরুলতাগুলি  
     ফুলপল্লবভারে  
     সরস কোমল বাহুবেষ্টনে  
     বাঁধিতে চাহিছে তারে।  
     শিখর গগনলীন  
     দুর্গম জনহীন,  
     বাসনাবিহগ একেলা সেথায়  
     ধাইছে রাত্রিদিন।  
      
     চারি দিকে তার কত আসা-যাওয়া,  
     কত গীত , কত কথা —  
     মাঝখানে শুধু ধ্যানের মতন  
     নিশ্চল নীরবতা।  
     দূরে গেলে তবু, একা  
     সে শিখর যায় দেখা —  
     চিত্তগগনে আঁকা থাকে তার  
     নিত্যনীহাররেখা। 
      
    ====== 

    আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।  
     তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে  
     কোরো না বিড়ম্বিত তারে।  
     আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,  
     আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,  
     এই সংগীতমুখরিত গগনে  
     তব গন্ধ করঙ্গিয়া তুলিয়ো।  
     এই বাহিরভূবনে দিশা হারায়ে  
     দিয়ো ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।  
      
     অতি নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে  
     আজি পল্লবে পল্লবে বাজে রে -  
     দূরে গগনে কাহার পথ চাহিয়া  
     আজি ব্যকুল বসুন্ধরা সাজে রে।  
     মোর পরানে দখিন বায়ু লাগিছে,  
     কারে দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে,  
     এই সৌরভবিহবল রজনী  
     কার চরণে ধরণীতলে জাগিছে।  
     ওগো সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,  
     তব গম্ভীর আহবান কারে। 
      
    ====== 

    কত অজানারে জানাইলে তুমি

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      কত অজানারে জানাইলে তুমি,  
     কত ঘরে দিলে ঠাঁই-  
     দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,  
     পরকে করিলে ভাই।  
     পুরনো আবাস ছেড়ে যাই যবে  
     মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে,  
     নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন  
     সে কথা যে ভুলে যাই।  
     দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,  
     পরকে করিলে ভাই।  
      
     জীবনে মরণে নিখিল ভুবনে  
     যখনি যেখানে লবে,  
     চির জনমের পরিচিত ওহে,  
     তুমিই চিনাবে সবে।  
     তোমারে জানিলে নাহি কেহ পর,  
     নাহি কোন মানা, নাহি কোন ডর,  
     সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ-  
     দেখা যেন সদা পাই।  
     দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,  
     পরকে করিলে ভাই। 
      
    ====== 

    স্পর্শ মনি

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    নদীতীরে বৃন্দাবনে সনাতন একমনে  
     জপিছেন নাম,  
     হেনকালে দীনবেশে ব্রাহ্মণ চরণে এসে  
     করিল প্রণাম।  
     শুধালেন সনাতন, কোথা হতে আগমন,  
     কী নাম ঠাকুর?'  
     বিপ্র কহে, কিবা কব, পেয়েছি দর্শন তব  
     ভ্রমি বহুদূর।  
     জীবন আমার নাম, মানকরে মোর ধাম,  
     জিলা বর্ধমানে--  
     এতবড়ো ভাগ্যহত দীনহীন মোর মতো  
     নাই কোনোখানে।  
     জমিজমা আছে কিছু, করে আছি মাথা নিচু,  
     অল্পস্বল্প পাই।  
     ক্রিয়াকর্ম-যজ্ঞযাগে বহু খ্যাতি ছিল আগে,  
     আজ কিছু নাই।  
     আপন উন্নতি লাগি শিব-কাছে বর মাগি  
     করি আরাধনা।  
     একদিন নিশিভোরে স্বপ্নে দেব কন মোরে--  
     পুরিবে প্রার্থনা!  
     যাও যমুনার তীর, সনাতন গোস্বামীর  
     ধরো দুটি পায়!  
     তাঁরে পিতা বলি মেনো, তাঁরি হাতে আছে জেনো  
     ধনের উপায়।'  
      
     শুনি কথা সনাতন ভাবিয়া আকুল হন--  
     কী আছে আমার!  
     যাহা ছিল সে সকলি ফেলিয়া এসেছি চলি--  
     ভিক্ষামাত্র সার।'  
     সহসা বিস্মৃতি ছুটে, সাধু ফুকারিয়া উঠে,  
     ঠিক বটে ঠিক।  
     একদিন নদীতটে কুড়ায়ে পেয়েছি বটে  
     পরশমানিক।  
     যদি কভু লাগে দানে সেই ভেবে ওইখানে  
     পুঁতেছি বালুতে--  
     নিয়ে যাও হে ঠাকুর, দুঃখ তব হবে দূর  
     ছুঁতে নাহি ছুঁতে।'  
      
     বিপ্র তাড়াতাড়ি আসি খুঁড়িয়া বালুকারাশি  
     পাইল সে মণি,  
     লোহার মাদুলি দুটি সোনা হয়ে উঠে ফুটি,  
     ছুঁইল যেমনি।  
     ব্রাহ্মণ বালুর 'পরে বিস্ময়ে বসিয়া পড়ে--  
     ভাবে নিজে নিজে।  
     যমুনা কল্লোলগানে চিন্তিতের কানে কানে  
     কহে কত কী যে!  
     নদীপারে রক্তছবি দিনান্তের ক্লান্ত রবি  
     গেল অস্তাচলে--  
     তখন ব্রাহ্মণ উঠে সাধুর চরণে লুটে  
     কহে অশ্রুজলে,  
     যে ধনে হইয়া ধনী মণিরে মান না মণি  
     তাহারি খানিক  
     মাগি আমি নতশিরে।' এত বলি নদীনীরে  
     ফেলিল মানিক। 
      
    ====== 

    বন্ধন 
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      বন্ধন? বন্ধন বটে, সকলি বন্ধন--  
     স্নেহ প্রেম সুখতৃষ্ণা; সে যে মাতৃপাণি  
     স্তন হতে স্তনান্তরে লইতেছে টানি,  
     নব নব রসস্রোতে পূর্ণ করি মন  
     সদা করাইছে পান। স্তন্যের পিপাসা  
     কল্যাণদায়িনীরূপে থাকে শিশুমুখে--  
     তেমনি সহজ তৃষ্ণা আশা ভালোবাসা  
     সমস্ত বিশ্বের রস কত সুখে দুখে  
     করিতেছে আকর্ষণ, জনমে জনমে  
     প্রাণে মনে পূর্ণ করি গঠিতেছে ক্রমে  
     দুর্লভ জীবন; পলে পলে নব আশ  
     নিয়ে যায় নব নব আস্বাদে আশ্রমে।  
     স্তন্যতৃষ্ণা নষ্ট করি মাতৃবন্ধপাশ  
     ছিন্ন করিবারে চাস কোন্ মুক্তিভ্রমে!  
      
    ====== 

    তোমরা ও আমরা

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      তোমরা হাসিয়া বহিয়া চলিয়া যাও  
     কুলুকুলুকল নদীর স্রোতের মতো।  
     আমরা তীরেতে দাঁড়ায়ে চাহিয়া থাকি,  
     মরমে গুমরি মরিছে কামনা কত।  
     আপনা-আপনি কানাকানি কর সুখে,  
     কৌতুকছটা উছসিছে চোখে মুখে,  
     কমলচরণ পড়িছে ধরণী-মাঝে,  
     কনকনূপুর রিনিকি ঝিনিকি বাঝে।  
     অঙ্গে অঙ্গ বাঁধিছে রঙ্গপাশে,  
     বাহুতে বাহুতে জড়িত ললিত লতা।  
     ইঙ্গিতরসে ধ্বনিয়া উঠিছে হাসি,  
     নয়নে নয়নে বহিছে গোপন কথা।  
     আঁখি নত করি একেলা গাঁথিছ ফুল,  
     মুকুর লইয়া যতনে বাঁধিছ চুল।  
     গোপন হৃদয়ে আপনি করিছ খেলা,  
     কী কথা ভাবিছ, কেমন কাটিছে বেলা।  
     চকিতে পলকে অলক উড়িয়া পড়ে,  
     ঈষৎ হেলিয়া আঁচল মেলিয়া যাও--  
     নিমেষ ফেলিতে আঁখি না মেলিতে,ত্বরা  
     নয়নের আড়ে না জানি কাহারে চাও।  
     যৌবনরাশি টুটিতে লুটিতে চায়,  
     বসনে শাসনে বাঁধিয়া রেখেছ তায়।  
     তবু শতবার শতধা হইয়া ফুটে,  
     চলিতে ফিরিতে ঝলকি চলকি উঠে।  
     আমরা মূর্খ কহিতে জানি নে কথা,  
     কী কথা বলিতে কী কথা বলিয়া ফেলি।  
     অসময়ে গিয়ে লয়ে আপনার মন,  
     পদতলে দিয়ে চেয়ে থাকি আঁখি মেলি।  
     তোমরা দেখিয়া চুপি চুপি কথা কও,  
     সখীতে সখীতে হাসিয়া অধীর হও,  
     বসন-আঁচল বুকেতে টানিয়া লয়ে  
     হেসে চলে যাও আশার অতীত হয়ে।  
     আমরা বৃহৎ অবোধ ঝড়ের মতো  
     আপন আবেগে ছুটিয়া চলিয়া আসি।  
     বিপুল আঁধারে অসীম আকাশ ছেয়ে  
     টুটিবারে চাহি আপন হৃদয়রাশি।  
     তোমরা বিজুলি হাসিতে হাসিতে চাও,  
     আঁধার ছেদিয়া মরম বিঁধিয়া দাও,  
     গগনের গায়ে আগুনের রেখা আঁকি  
     চকিতে চরণে চলে যাও দিয়ে ফাঁকি।  
     অযতনে বিধি গড়েছে মোদের দেহ,  
     নয়ন অধর দেয় নি ভাষায় ভরে।  
     মোহন মধুর মন্ত্র জানি নে মোরা,  
     আপনা প্রকাশ করিব কেমন করে?  
     তোমরা কোথায় আমরা কোথায় আছি,  
     কোনো সুলগনে হব না কি কাছাকাছি।  
     তোমরা হাসিয়া বহিয়া চলিয়া যাবে,  
     আমরা দাঁড়ায়ে রহিব এমনি ভাবে!  
      
    ====== 

    প্রেমের হাতে ধরে দেবো

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

     প্রেমের হাতে ধরা দেব  
     তাই রয়েছি বসে;  
     অনেক দেরি হয়ে গেল,  
     দোষী অনেক দোষে।  
     বিধিবিধান-বাঁধনডোরে  
     ধরতে আসে, যাই সে সরে,  
     তার লাগি যা শাস্তি নেবার  
     নেব মনের তোষে।  
     প্রেমের হাতে ধরা দেব  
     তাই রয়েছি বসে।   
      
     লোকে আমায় নিন্দা করে,  
     নিন্দা সে নয় মিছে,  
     সকল নিন্দা মাথায় ধরে  
     রব সবার নীচে।  
     শেষ হয়ে যে গেল বেলা,  
     ভাঙল বেচা-কেনার মেলা,  
     ডাকতে যারা এসেছিল  
     ফিরল তারা রোষে।  
     প্রেমের হাতে ধরা দেব  
     তাই রয়েছি বসে।  
      
    ====== 

    চাই গো আমি তোমারে চাই

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      চাই গো আমি তোমারে চাই  
     তোমায় আমি চাই--  
     এই কথাটি সদাই মনে  
     বলতে যেন পাই।  
     আর যা-কিছু বাসনাতে  
     ঘুরে বেড়াই দিনে রাতে  
     মিথ্যা সে-সব মিথ্যা ওগো  
     তোমায় আমি চাই।   
      
     রাত্রি যেমন লুকিয়ে রাখে  
     আলোর প্রার্থনাই--  
     তেমনি গভীর মোহের মাঝে  
     তোমায় আমি চাই।  
     শান্তিরে ঝড় যখন হানে  
     শান্তি তবু চায় সে প্রাণে,  
     তেমনি তোমায় আঘাত করি  
     তবু তোমায় চাই।  
      
    ====== 
    কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি যাব 
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি  
     যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে,  
     ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী  
     কোথায় যেতেছি কোন্ দেশে সে কোন্ দেশে।  
     কূলহারা সেই সমুদ্র-মাঝখানে  
     শোনাব গান একলা তোমার কানে,  
     ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন-হারা  
     আমার সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।   
      
     আজো সময় হয়নি কিতার,কাজ কি আছে বাকি।  
     ওগো ওই-যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।  
     মলিন আলোয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখি  
     আপন কুলায়-মাঝে সবাই এল ফিরে।  
     কখন তুমি আসবে ঘাটের 'পরে  
     বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে।  
     অস্তরবির শেষ আলোটির মতো  
     তরী নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে।  
      
    ====== 

    সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে  

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      
    সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে  
     অরুণ-বরণ পারিজাত লয়ে হাতে।  
     নিদ্রিত পুরী, পথিক ছিল না পথে,  
     একা চলি গেলে তোমার সোনার রথে,  
     বারেক থামিয়া মোর বাতায়নপানে  
     চেয়েছিলে তব করুণ নয়নপাতে।  
     সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে।   
      
     স্বপন আমার ভরেছিল কোন্ গন্ধে  
     ঘরের আঁধার কেঁপেছিল কী আনন্দে,  
     ধুলায় লুটানো নীরব আমার বীণা  
     বেজে উঠেছিল অনাহত কী আঘাতে।  
     কতবার আমি ভেবেছিনু উঠি-উঠি  
     আলস ত্যজিয়া পথে বাহিরাই ছুটি,  
     উঠিনু যখন তখন গিয়েছ চলে--  
     দেখা বুঝি আর হল না তোমার সাথে।  
     সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে।  
      
    ====== 

    জীবন যখন শুকায়ে যায়  

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    জীবন যখন শুকায়ে যায়  
     করুণাধারায় এসো।  
     সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,  
     গীতসুধারসে এসো।   
      
     কর্ম যখন প্রবল-আকার  
     গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার,  
     হৃদয়প্রান্তে হে নীরব নাথ,  
     শান্তচরণে এসো।   
      
     আপনারে যবে করিয়া কৃপণ  
     কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন,  
     দুয়ার খুলিয়া হে উদার নাথ,  
     রাজ-সমারোহে এসো।   
      
     বাসনা যখন বিপুল ধুলায়  
     অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায়  
     ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র,  
     রুদ্র আলোকে এসো।  
      
    ====== 

    মনে করি এইখানে শেষ

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      
    মনে করি এইখানে শেষ  
     কোথা বা হয় শেষ  
     আবার তোমার সভা থেকে  
     আসে যে আদেশ।  
     নূতন গানে নূতন রাগে  
     নূতন করে হৃদয় জাগে,  
     সুরের পথে কোথা যে যাই  
     না পাই সে উদ্দেশ।   
      
     সন্ধ্যাবেলার সোনার আভায়  
     মিলিয়ে নিয়ে তান  
     পূরবীতে শেষ করেছি  
     যখন আমার গান--  
     নিশীথ রাতের গভীর সুরে  
     আবার জীবন উঠে পুরে,  
     তখন আমার নয়নে আর  
     রয় না নিদ্রালেশ।  
     

    বাংলা কবিতা স্টাটাস | বাংলা কবিতার লাইন | বাংলা কবিতা সমূহ | বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |বাংলা কবিতা pdf

    ====== 

    ওগো আমার এই জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    ওগো আমার এই জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা,
           মরণ, আমার মরণ, তুমি কও আমারে কথা।
                  সারা জনম তোমার লাগি
                  প্রতিদিন যে আছি জাগি,
           তোমার তরে বহে বেড়াই
                        দুঃখসুখের ব্যথা।
           মরণ, আমার মরণ, তুমি
                      কও আমারে কথা।
           যা পেয়েছি, যা হয়েছি
                        যা-কিছু মোর আশা।
           না জেনে ধায় তোমার পানে
                        সকল ভালোবাসা।
                  মিলন হবে তোমার সাথে,
                  একটি শুভ দৃষ্টিপাতে,
           জীবনবধূ হবে তোমার
                  নিত্য অনুগতা;
           মরণ, আমার মরণ, তুমি
                 কও আমারে কথা।
                               বরণমালা গাঁথা আছে,
                                             আমার চিত্তমাঝে,
                               কবে নীরব হাস্যমুখে
                                             আসবে বরের সাজে।
                                    সেদিন আমার রবে না ঘর,
                                    কেই-বা আপন, কেই-বা অপর,
                               বিজন রাতে পতির সাথে
                                        মিলবে পতিব্রতা।
                               মরণ, আমার মরণ, তুমি
                                         কও আমারে কথা।

    শেষের মধ্যে অশেষ আছে

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    শেষের মধ্যে অশেষ আছে,
         এই কথাটি মনে
    আজকে আমার গানের শেষে
           জাগছে ক্ষণে ক্ষণে।
                               সুর গিয়েছে থেমে তবু
                               থামতে যেন চায় না কভু,
                               নীরবতায় বাজছে বীণা
                                      বিনা প্রয়োজনে।
    তারে যখন আঘাত লাগে,
                 বাজে যখন সুরে--
    সবার চেয়ে বড়ো যে গান
                 সে রয় বহুদূরে।
                               সকল আলাপ গেলে থেমে
                               শান্ত বীণায় আসে নেমে,
                               সন্ধ্যা যেমন দিনের শেষে
                                      বাজে গভীর স্বনে।
    কলিকাতা, ২৬ শ্রাবণ, ১৩১৭

    সোনার তরী

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর   

    গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
         কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
                রাশি রাশি ভারা ভারা
                ধান কাটা হল সারা,
                ভরা নদী ক্ষুরধারা
                        খরপরশা।
         কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
         একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
         চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
                পরপারে দেখি আঁকা
                তরুছায়ামসীমাখা
                গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
                        প্রভাতবেলা--
         এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।
         গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
         দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
                ভরা-পালে চলে যায়,
                কোনো দিকে নাহি চায়,
                ঢেউগুলি নিরুপায়
                        ভাঙে দু-ধারে--
         দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
    ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
         বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
                যেয়ো যেথা যেতে চাও,
                যারে খুশি তারে দাও,
                শুধু তুমি নিয়ে যাও
                        ক্ষণিক হেসে
         আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।
         যত চাও তত লও তরণী-'পরে।
         আর আছে?-- আর নাই, দিয়েছি ভরে।
                এতকাল নদীকূলে
                যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
                সকলি দিলাম তুলে
                        থরে বিথরে--
         এখন আমারে লহ করুণা করে।
         ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-- ছোটো সে তরী
         আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
                শ্রাবণগগন ঘিরে
                ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
                শূন্য নদীর তীরে
                        রহিনু পড়ি--
         যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

    ফাল্গুন  ১২৯৮  শিলাইদহ।  বোট

    যেতে নাহি দেবো 

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর;
              হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর।
              জনশূন্য পল্লিপথে ধূলি উড়ে যায়
              মধ্যাহ্ন-বাতাসে; স্নিগ্ধ অশত্থের ছায়
              ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিণী জীর্ণ বস্ত্র পাতি
              ঘুমায়ে পড়েছে; যেন রৌদ্রময়ী রাতি
              ঝাঁ ঝাঁ করে চারি দিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম--
              শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম।
              গিয়েছে আশ্বিন-- পূজার ছুটির শেষে
              ফিরে যেতে হবে আজি বহুদূরদেশে
              সেই কর্মস্থানে। ভৃত্যগণ ব্যস্ত হয়ে
              বাঁধিছে জিনিসপত্র দড়াদড়ি লয়ে,
              হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি এ-ঘরে ও-ঘরে।
              ঘরের গৃহিণী, চক্ষু ছলছল করে,
              ব্যথিছে বক্ষের কাছে পাষাণের ভার,
              তবুও সময় তার নাহি কাঁদিবার
              একদণ্ড তরে; বিদায়ের আয়োজনে
              ব্যস্ত হয়ে ফিরে; যথেষ্ট না হয় মনে
              যত বাড়ে বোঝা। আমি বলি, "এ কী কাণ্ড!
              এত ঘট এত পট হাঁড়ি সরা ভাণ্ড
              বোতল বিছানা বাক্স  রাজ্যের বোঝাই
              কী করিব লয়ে  কিছু এর রেখে যাই
              কিছু লই সাথে।'
                              সে কথায় কর্ণপাত
              নাহি করে কোনো জন। "কী জানি দৈবাৎ
              এটা ওটা আবশ্যক যদি হয় শেষে
              তখন কোথায় পাবে বিভুঁই বিদেশে?
              সোনামুগ সরু চাল সুপারি ও পান;
             ও হাঁড়িতে ঢাকা আছে দুই-চারিখান
              গুড়ের পাটালি; কিছু ঝুনা নারিকেল;
               দুই ভাণ্ড ভালো রাই-সরিষার তেল;
               আমসত্ত্ব আমচুর; সের দুই দুধ--
               এই-সব শিশি কৌটা ওষুধবিষুধ।
               মিষ্টান্ন রহিল কিছু হাঁড়ির ভিতরে,
               মাথা খাও, ভুলিয়ো না, খেয়ো মনে করে।'
               বুঝিনু যুক্তির কথা বৃথা বাক্যব্যয়।
               বোঝাই হইল উঁচু পর্বতের ন্যায়।
               তাকানু ঘড়ির পানে, তার পরে ফিরে
               চাহিনু প্রিয়ার মুখে; কহিলাম ধীরে,
               "তবে আসি'। অমনি ফিরায়ে মুখখানি
                নতশিরে চক্ষু-'পরে বস্ত্রাঞ্চল টানি
                অমঙ্গল অশ্রুজল করিল গোপন।
                বাহিরে দ্বারের কাছে বসি অন্যমন
                কন্যা মোর চারি বছরের। এতক্ষণ
                অন্য দিনে হয়ে যেত স্নান সমাপন,
                দুটি অন্ন মুখে না তুলিতে আঁখিপাতা
                মুদিয়া আসিত ঘুমে; আজি তার মাতা
                দেখে নাই তারে; এত বেলা হয়ে যায়
                নাই স্নানাহার। এতক্ষণ ছায়াপ্রায়
                ফিরিতেছিল সে মোর কাছে কাছে ঘেঁষে,
                চাহিয়া দেখিতেছিল মৌন নির্নিমেষে
                বিদায়ের আয়োজন। শ্রান্তদেহে এবে
                বাহিরের দ্বারপ্রান্তে কী জানি কী ভেবে
                চুপিচাপি বসে ছিল। কহিনু যখন
                "মা গো, আসি' সে কহিল বিষণ্ণ-নয়ন
                ম্লান মুখে, "যেতে আমি দিব না তোমায়।'
                যেখানে আছিল বসে রহিল সেথায়,
                ধরিল না বাহু মোর, রুধিল না দ্বার,
                শুধু নিজ হৃদয়ের স্নেহ-অধিকার
                প্রচারিল--"যেতে আমি দিব না তোমায়'।
                তবুও সময় হল শেষ, তবু হায়
                যেতে দিতে হল।
                                    ওরে মোর মূঢ় মেয়ে,
                কে রে তুই, কোথা হতে কী শকতি পেয়ে
                কহিলি এমন কথা, এত স্পর্ধাভরে--
                "যেতে আমি দিব না তোমায়'? চরাচরে
                কাহারে রাখিবি ধরে দুটি ছোটো হাতে
                গরবিনী, সংগ্রাম করিবি কার সাথে
                বসি গৃহদ্বারপ্রান্তে শ্রান্ত ক্ষুদ্র দেহ
                শুধু লয়ে ওইটুকু বুকভরা স্নেহ।
                ব্যথিত হৃদয় হতে বহু ভয়ে লাজে
                মর্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে
                এ জগতে, শুধু বলে রাখা "যেতে দিতে
                ইচ্ছা নাহি'। হেন কথা কে পারে বলিতে
                "যেতে নাহি দিব'! শুনি তোর শিশুমুখে
                স্নেহের প্রবল গর্ববাণী, সকৌতুকে
                হাসিয়া সংসার টেনে নিয়ে গেল মোরে,
                তুই শুধু পরাভূত চোখে জল ভ'রে
                দুয়ারে রহিলি বসে ছবির মতন,
                আমি দেখে চলে এনু মুছিয়া নয়ন।
                 চলিতে চলিতে পথে হেরি দুই ধারে
                 শরতের শস্যক্ষেত্র নত শস্যভারে
                 রৌদ্র পোহাইছে। তরুশ্রেণী উদাসীন
                 রাজপথপাশে, চেয়ে আছে সারাদিন
                 আপন ছায়ার পানে। বহে খরবেগ
                 শরতের ভরা গঙ্গা। শুভ্র খণ্ডমেঘ
                 মাতৃদুগ্ধ পরিতৃপ্ত সুখনিদ্রারত
                 সদ্যোজাত সুকুমার গোবৎসের মতো
                 নীলাম্বরে শুয়ে। দীপ্ত রৌদ্রে অনাবৃত
                 যুগ-যুগান্তরক্লান্ত দিগন্তবিস্তৃত
                 ধরণীর পানে চেয়ে ফেলিনু নিশ্বাস।
                  কী গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ,
                  সমস্ত পৃথিবী। চলিতেছি যতদূর
                  শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর
                  "যেতে আমি দিব না তোমায়'। ধরণীর
                  প্রান্ত হতে নীলাভ্রের সর্বপ্রান্ততীর
                  ধ্বনিতেছে চিরকাল অনাদ্যন্ত রবে,
                  "যেতে নাহি দিব। যেতে নাহি দিব।' সবে
                   কহে "যেতে নাহি দিব'। তৃণ ক্ষুদ্র অতি
                   তারেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী
                   কহিছেন প্রাণপণে "যেতে নাহি দিব'।
                   আয়ুক্ষীণ দীপমুখে শিখা নিব-নিব,
                   আঁধারের গ্রাস হতে কে টানিছে তারে
                   কহিতেছে শত বার "যেতে দিব না রে'।
                   এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে
                    সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে
                    গভীর ক্রন্দন--"যেতে নাহি দিব'।   হায়,
                    তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।
                    চলিতেছে এমনি অনাদি কাল হতে।
                    প্রলয়সমুদ্রবাহী সৃজনের স্রোতে
                    প্রসারিত-ব্যগ্র-বাহু জ্বলন্ত-আঁখিতে
                    "দিব না দিব না যেতে' ডাকিতে ডাকিতে
                    হু হু করে তীব্রবেগে চলে যায় সবে
                    পূর্ণ করি বিশ্বতট আর্ত কলরবে।
                    সম্মুখ-ঊর্মিরে ডাকে পশ্চাতের ঢেউ
                    "দিব না দিব না যেতে'-- নাহি শুনে কেউ
                    নাহি কোনো সাড়া।
                                       চারি দিক হতে আজি
                     অবিশ্রাম কর্ণে মোর উঠিতেছে বাজি
                     সেই বিশ্ব-মর্মভেদী করুণ ক্রন্দন
                     মোর কন্যাকণ্ঠস্বরে; শিশুর মতন
                     বিশ্বের অবোধ বাণী। চিরকাল ধরে
                     যাহা পায় তাই সে হারায়, তবু তো রে
                     শিথিল হল না মুষ্টি, তবু অবিরত
                     সেই চারি বৎসরের কন্যাটির মতো
                     অক্ষুণ্ন প্রেমের গর্বে কহিছে সে ডাকি
                     "যেতে নাহি দিব'। ম্লান মুখ, অশ্রু-আঁখি,
                     দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে টুটিছে গরব,
                     তবু প্রেম কিছুতে না মানে পরাভব,
                     তবু বিদ্রোহের ভাবে রুদ্ধ কণ্ঠে কয়
                     "যেতে নাহি দিব'। যত বার পরাজয়
                   তত বার কহে, "আমি ভালোবাসি যারে
                     সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে।
                     আমার আকাঙক্ষা-সম এমন আকুল,
                     এমন সকল-বাড়া, এমন অকূল,
                     এমন প্রবল বিশ্বে কিছু আছে আর!'
                     এত বলি দর্পভরে করে সে প্রচার
                     "যেতে নাহি দিব'। তখনি দেখিতে পায়,
                     শুষ্ক তুচ্ছ ধূলি-সম উড়ে চলে যায়
                     একটি নিশ্বাসে তার আদরের ধন;
                     অশ্রুজলে ভেসে যায় দুইটি নয়ন,
                     ছিন্নমূল তরু-সম পড়ে পৃথ্বীতলে
                     হতগর্ব নতশির। তবু প্রেম বলে,
                     "সত্যভঙ্গ হবে না বিধির। আমি তাঁর
                     পেয়েছি স্বাক্ষর-দেওয়া মহা অঙ্গীকার
                     চির-অধিকার-লিপি।'-- তাই স্ফীত বুকে
                     সর্বশক্তি মরণের মুখের সম্মুখে
                     দাঁড়াইয়া সুকুমার ক্ষীণ তনুলতা
                     বলে, "মৃত্যু তুমি নাই।-- হেন গর্বকথা!
                     মৃত্যু হাসে বসি। মরণপীড়িত সেই
                     চিরজীবী প্রেম আচ্ছন্ন করেছে এই
                     অনন্ত সংসার, বিষণ্ণ নয়ন-'পরে
                     অশ্রুবাষ্প-সম, ব্যাকুল আশঙ্কাভরে
                     চির-কম্পমান। আশাহীন শ্রান্ত আশা
                     টানিয়া রেখেছে এক বিষাদ-কুয়াশা
                     বিশ্বময়। আজি যেন পড়িছে নয়নে--
                     দুখানি অবোধ বাহু বিফল বাঁধনে
                     জড়ায়ে পড়িয়া আছে নিখিলেরে ঘিরে,
                     স্তব্ধ সকাতর। চঞ্চল স্রোতের নীরে
                     পড়ে আছে একখানি অচঞ্চল ছায়া--
                     অশ্রুবৃষ্টিভরা কোন্‌ মেঘের সে মায়া।
                   তাই আজি শুনিতেছি তরুরক মর্মরে
                     এত ব্যাকুলতা; অলস ঔদাস্যভরে
                     মধ্যাহ্নের তপ্ত বায়ু মিছে খেলা করে
                     শুষ্ক পত্র লয়ে; বেলা ধীরে যায় চলে
                     ছায়া দীর্ঘতর করি অশত্থের তলে।
                     মেঠো সুরে কাঁদে যেন অনন্তের বাঁশি
                     বিশ্বের প্রান্তর-মাঝে; শুনিয়া উদাসী
                     বসুন্ধরা বসিয়া আছেন এলোচুলে
                     দূরব্যাপী শস্যক্ষেত্রে জাহ্নবীর কূলে
                     একখানি রৌদ্রপীত হিরণ্য-অঞ্চল
                     বক্ষে টানি দিয়া; স্থির নয়নযুগল
                     দূর নীলাম্বরে মগ্ন; মুখে নাহি বাণী।
                     দেখিলাম তাঁর সেই ম্লান মুখখানি
                     সেই দ্বারপ্রান্তে লীন, স্তব্ধ মর্মাহত
                     মোর চারি বৎসরের কন্যাটির মতো।
      জোড়াসাঁকো, ১৪ কার্তিক, ১২৯৯

    আমাদের ছোটো নদী

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে 
    বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। 
    পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি, 
    দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি। 

    চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা, 
    একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। 
    কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক, 
    রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক। 

    আর-পারে আমবন তালবন চলে, 
    গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে। 
    তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাইবার কালে 
    গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে। 

    সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে 
    আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে। 
    বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে, 
    বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে। 

    আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর 
    মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর। 
    মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে, 
    ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে। 
    দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া, 
    বরষার উৎসবে জেগে ওঠে পাড়া।।

    বিপদে মোরে রক্ষা করো

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  

    বিপদে মোরে রক্ষা করো
    এ নহে মোর প্রার্থনা,
    বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
    দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে
    নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
    দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।
    সহায় মোর না যদি জুটে
    নিজের বল না যেন টুটে,
    সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি
    লভিলে শুধু বঞ্চনা
    নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।

    আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
    এ নহে মোর প্রার্থনা,
    তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
    আমার ভার লাঘব করি
    নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
    বহিতে পারি এমনি যেন হয়।
    নম্রশিরে সুখের দিনে
    তোমারি মুখ লইব চিনে,
    দুখের রাতে নিখিল ধরা
    যেদিন করে বঞ্চনা
    তোমারে যেন না করি সংশয়।

    যে কথা বলিতে চাই

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর    

     যে-কথা বলিতে চাই
             বলা হয় নাই,
                 সে কেবল এই--
    চিরদিবসের বিশ্ব আঁখিসম্মুখেই
                 দেখিনু সহস্রবার
                 দুয়ারে আমার।
         অপরিচিতের এই চির পরিচয়
    এতই সহজে নিত্য ভরিয়াছে গভীর হৃদয়
         সে-কথা বলিতে পারি এমন সরল বাণী
              আমি নাহি জানি।
    শূন্য প্রান্তরের গান বাজে ওই একা ছায়াবটে;
         নদীর এপারে ঢালু তটে
              চাষি করিতেছে চাষ;
         উড়ে চলিয়াছে হাঁস
    ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য বালুতীরতলে।
              চলে কি না চলে
            ক্লান্তস্রোত শীর্ণ নদী, নিমেষ-নিহত
              আধো-জাগা নয়নের মতো।
              পথখানি বাঁকা
         বহুশত বরষের পদচিহ্ন-আঁকা
    চলেছে মাঠের ধারে, ফসল-খেতের যেন মিতা,
         নদীসাথে কুটিরের বহে কুটুম্বিতা।
    ফাল্গুনের এ-আলোয় এই গ্রাম, ওই শূন্য মাঠ,
                  ওই খেয়াঘাট,
    ওই নীল নদীরেখা, ওই দূর বালুকার কোলে
          নিভৃত জলের ধারে চখাচখি কাকলি-কল্লোলে
              যেখানে বসায় মেলা-- এই সব ছবি
                  কতদিন দেখিয়াছে কবি।
    শুধু এই চেয়ে দেখা, এই পথ বেয়ে চলে যাওয়া,
         এই আলো, এই হাওয়া,
    এইমতো অস্ফুটধ্বনির গুঞ্জরণ,
         ভেসে-যাওয়া মেঘ হতে
         অকস্মাৎ নদীস্রোতে
              ছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ,
    যে আনন্দ-বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস
              হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারি প্রকাশ।
    পদ্মা, ৮ ফাল্গুন, ১৩২২ 



    মেঘের পরে মেঘ জমেছে

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর   

    মেঘের 'পরে মেঘ জমেছে,
                 আঁধার করে আসে,
    আমায় কেন বসিয়ে রাখ
                 একা দ্বারের পাশে।
                               কাজের দিনে নানা কাজে
                               থাকি নানা লোকের মাঝে,
                               আজ আমি যে বসে আছি
             তোমারি আশ্বাসে।
    আমায় কেন বসিয়ে রাখ
                একা দ্বারের পাশে।
     
    তুমি যদি না দেখা দাও,
                কর আমায় হেলা,
    কেমন করে কাটে আমার
                এমন বাদল-বেলা।
        দূরের পানে মেলে আঁখি
        কেবল আমি চেয়ে থাকি,
                        পরান আমার কেঁদে বেড়ায়
            দুরন্ত বাতাসে।
    আমায় কেন বসিয়ে রাখ
             একা দ্বারের পাশে।
     
     
    বোলপুর, আষাঢ়, ১৩১৬

    জীবন যখন শুকায়ে যায়

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর    


    জীবন যখন শুকায়ে যায়
                  করুণাধারায় এসো।
           সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,
                  গীতসুধারসে এসো।
     
                               কর্ম যখন প্রবল-আকার
                               গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার,
                               হৃদয়প্রান্তে হে নীরব নাথ,
                                      শান্তচরণে এসো।
     
           আপনারে যবে করিয়া কৃপণ
           কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন,
           দুয়ার খুলিয়া হে উদার নাথ,
                  রাজ-সমারোহে এসো।
     
                                      বাসনা যখন বিপুল ধুলায়
                                      অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায়
                                      ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র,
                                             রুদ্র আলোকে এসো।
     
     
    ২৮ চৈত্র, ১৩১৬

    নিরুদ্দেশ যাত্রা

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে
            হে সুন্দরী?
    বলো  কোন্‌ পার ভিড়িবে তোমার
            সোনার তরী।
    যখনি শুধাই, ওগো বিদেশিনী,
    তুমি হাস শুধু, মধুরহাসিনী--
    বুঝিতে না পারি, কী জানি কী আছে
            তোমার মনে।
    নীরবে দেখাও অঙ্গুলি তুলি
    অকূল সিন্ধু উঠিছে আকুলি,
    দূরে পশ্চিমে ডুবিছে তপন
            গগনকোণে।
    কী আছে হোথায়-- চলেছি কিসের
            অম্বেষণে?
    বলো দেখি মোরে, শুধাই তোমায়
             অপরিচিতা--
    ওই যেথা জ্বলে সন্ধ্যার কূলে
             দিনের চিতা,
    ঝলিতেছে জল তরল অনল,
    গলিয়া পড়িছে অম্বরতল,
    দিক্‌বধূ যেন ছলছল-আঁখি
             অশ্রুজলে,
    হোথায় কি আছে আলয় তোমার
    ঊর্মিমুখর সাগরের পার,
    মেঘচুম্বিত অস্তগিরির
             চরণতলে?
    তুমি হাস শুধু মুখপানে চেয়ে
             কথা না ব'লে।
    হু হুক'রে বায়ু ফেলিছে সতত
             দীর্ঘশ্বাস।
    অন্ধ আবেগে করে গর্জন
             জলোচ্ছ্বাস।
    সংশয়ময় ঘননীল নীর,
    কোনো দিকে চেয়ে নাহি হেরি তীর,
    অসীম রোদন জগৎ প্লাবিয়া
             দুলিছে যেন।
    তারি 'পরে ভাসে তরণী হিরণ,
    তারি 'পরে পড়ে সন্ধ্যাকিরণ,
    তারি মাঝে বসি এ নীরব হাসি
             হাসিছ কেন?
    আমি তো বুঝি না কী লাগি তোমার
             বিলাস হেন।
    যখন প্রথম ডেকেছিলে তুমি
              "কে যাবে সাথে'
    চাহিনু বারেক তোমার নয়নে
              নবীন প্রাতে।
    দেখালে সমুখে প্রসারিয়া কর
    পশ্চিম-পানে অসীম সাগর,
    চঞ্চল আলো আশার মতন
              কাঁপিছে জলে।
    তরীতে উঠিয়া শুধানু তখন
    আছে কি হোথায় নবীন জীবন,
    আশার স্বপন ফলে কি হোথায়
              সোনার ফলে?
    মুখপানে চেয়ে হাসিলে কেবল
              কথা না ব'লে।
    তার পরে কভু উঠিয়াছে মেঘ
              কখনো রবি--
    কখনো ক্ষুব্ধ সাগর, কখনো
              শান্ত ছবি।
    বেলা বহে যায়, পালে লাগে বায়--
    সোনার তরণী কোথা চলে যায়,
    পশ্চিমে হেরি নামিছে তপন
              অস্তাচলে।
    এখন বারেক শুধাই তোমায়,
    স্নিগ্ধ মরণ আছে কি হোথায়,
    আছে কি শান্তি, আছে কি সুপ্তি
              তিমির-তলে?
    হাসিতেছ তুমি তুলিয়া নয়ন
              কথা না ব'লে।
    আঁধার রজনী আসিবে এখনি
              মেলিয়া পাখা,
    সন্ধ্যা-আকাশে স্বর্ণ-আলোক
              পড়িবে ঢাকা।
    শুধু ভাসে তব দেহসৌরভ,
    শুধু কানে আসে জল-কলরব,
    গায়ে উড়ে পড়ে বায়ুভরে তব
              কেশের রাশি।
    বিকল হৃদয় বিবশ শরীর
    ডাকিয়া তোমারে কহিব অধীর,
    "কোথা আছ  ওগো  করহ পরশ
              নিকটে আসি।'
    কহিবে না কথা, দেখিতে পাব না
              নীরব হাসি।
     
     
      ২৭ অগ্রহায়ণ  ১৩০০

     যেদিন তুমি আপনি ছিলে একা 
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      যেদিন তুমি আপনি ছিলে একা
              আপনাকে তো হয় নি তোমার দেখা।
         সেদিন কোথাও কারো লাগি ছিল না পথ-চাওয়া;
              এপার হতে ওপার বেয়ে
                  বয় নি ধেয়ে
         কাঁদন-ভরা বাঁধন-ছেঁড়া হাওয়া।
     
              আমি এলেম, ভাঙল তোমার ঘুম,
         শূন্যে শূন্যে ফুটল আলোর আনন্দ-কুসুম।
              আমায় তুমি ফুলে ফুলে
                  ফুটিয়ে তুলে
         দুলিয়ে দিলে নানা রূপের দোলে।
    আমায় তুমি তারায় তারায় ছড়িয়ে দিয়ে কুড়িয়ে নিলে কোলে।
         আমায় তুমি মরণমাঝে লুকিয়ে ফেলে
              ফিরে ফিরে নূতন করে পেলে।
     
              আমি এলেম, কাঁপল তোমার বুক,
              আমি এলেম, এল তোমার দুখ,
         আমি এলেম, এল তোমার আগুনভরা আনন্দ,
         জীবন-মরণ তুফান-তোলা ব্যাকুল বসন্ত।
              আমি এলেম, তাই তো তুমি এলে,
                  আমার মুখে চেয়ে
                  আমার পরশ পেয়ে
                          আপন পরশ পেলে।
     
         আমার চোখে লজ্জা আছে, আমার বুকে ভয়,
              আমার মুখে ঘোমটা পড়ে রয়;
         দেখতে তোমায় বাধে ব'লে পড়ে চোখের জল।
                  ওগো আমার প্রভু,
                  জানি আমি তবু
              আমায় দেখবে ব'লে তোমার অসীম কৌতূহল,
              নইলে তো এই সূর্যতারা সকলি নিস্ফল।
     
     
      পদ্মাতীরে, ২৫ মাঘ, ১৩২১

    আজ প্রভাতে আকাশটি এই
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    আজ প্রভাতের আকাশটি এই
                                শিশির-ছলছল,
              নদীর ধারের ঝাউগুলি ওই
                                রৌদ্রে ঝলমল,
                        এমনি নিবিড় করে
              এরা    দাঁড়ায় হৃদয় ভরে
                                তাই তো আমি জানি
         বিপুল   বিশ্বভুবনখনি
              অকূল মানস-সাগরজলে
                         কমল টলমল।
                     তাই তো আমি জানি
         আমি    বাণীর সাথে বাণী,
         আমি    গানের সাথে গান,
         আমি    প্রাণের সাথে প্রাণ,
         আমি    অন্ধকারের হৃদয়-ফাটা
                        আলোক জ্বলজ্বল।
     
     
      শ্রীনগর। কাশ্মীর, ৭ কার্তিক, ১৩২২

    টাগঃবাংলার কবিতা,বাংলা কবিতা সমূহ,বিখ্যাত কবিতা সমগ্র, বাংলা কবিতা রােমান্টিক,ছােট কবিতা,বাংলা কবিতা স্ট্যাটাস,বিখ্যাত কবিতার লাইন,বাংলা কবিতা স্টাটাস,বাংলা কবিতার লাইন,বাংলা কবিতা সমূহ, বাংলা কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 
      
                                   
    Previous Post Next Post
    আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত হতে ক্লিক করুন