মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার রচনা - মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার | Madokashoktir Porinam O Protikar Rochona

মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার রচনা - মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার, Madokashoktir Porinam O Protikar Rochona, মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার প্রভাব, মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার প্রভাব ও আমাদের যুবসমাজ, মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার অনুচ্ছেদ রচনা

    মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার রচনা

    ভূমিকা : বিশ্বব্যাপী মানবসভ্যতার জন্যে এক নিকষ কালাে অধ্যায় মাদকাসক্তি । মাদক এক সর্বনাশা মরণনেশা । বিশ্বের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি মানুষ এ মরণনেশায় আসক্ত । এর মধ্যে এশিয়ার সার্কভুক্ত ৭ টি দেশে , এর সংখ্যা এক কোটির কিছু বেশি । বাংলাদেশেও মােট জনগােষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ মাদকের নীল । নেশায় আক্রান্ত । বিশেষ করে তরুণদের মাঝে মাদকের ভয়াবহ প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক । এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার , সমাজ , দেশ— এককথায় সমগ্র জাতি । দুর্বার তারুণ্য হারিয়ে ফেলছে অফুরান প্রাণশক্তি , অজেয় । সাহস আর বিদ্রোহী মনােবল । দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও প্রগতি হচ্ছে বিপন্ন । 


    মাদকের উৎস : আন্তর্জাতিক বেশ কিছু চোরাচালানি সিন্ডিকেট আকাশপথে কিংবা সীমান্তপথে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তােলে । বাংলাদেশেও এ ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় । কিছুকাল আগেও থাইল্যান্ড , মায়ানমার ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘ গােল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ’ বা ‘ স্বর্ণ ত্রিভুজ নামে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের স্বর্গভূমি । ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে গােল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ভেঙে যায় । পরবর্তীকালে ইরান , আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে নিয়ে গড়ে তােলা হয় মাদক পাচারের নতুন স্বর্গ ‘ গােল্ডেন ক্রিসেন্ট । পৃথিবীব্যাপী মাদকদ্রব্যের অবাধ বিস্তৃতির পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক এসব মাফিয়া চক্র । পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছে এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক । সন্ত্রাসবাদের মদদপুষ্ট এ মাদক ব্যবসায়ীরা যেসব মাদকদ্রব্য চোরাচালান করে থাকে তার মধ্যে উল্লেখযােগ্য হেরােইন , ইয়াবা , আফিম , কোকেন , মারিজুয়ানা , ব্রাউন সুগার , হাসিস , স্মাক , হােপ ইত্যাদি । নেশার ইতিহাস সুপ্রাচীন হলেও তা ছিল মদ , গাঁজা , আফিম , চরস , ভাং ইত্যাদির মধ্যে সীমিত । ফরাসি বিপ্লবের সময় পরাজিত সৈনিকদের অনেকেই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মাদকে আসক্ত হন । কিছু কিছু মাদক ব্যাথা নিরাময়ে এবং চেতনানাশক হিসেবে ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং এর পরে ব্যথা উপশম ছাড়াও নেশার উপকরণ হিসেবে মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে । ব্রাজিল , বলিভিয়া , কলম্বিয়া , ইকুয়েডরসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে মাদক তৈরি ও চোরাচালানের বিশাল চক্র গড়ে ওঠে । সেই সাথে তা পাচার হতে থাকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলােয় । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে , অতীতে উন্নত দেশগুলাের শতকরা আশি ভাগ লােকই মাদকে কম বেশি আসক্ত ছিল । বর্তমানে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলােতেও এ আসক্তি ছড়িয়ে গেছে । বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকের মধ্যে তরুণ সমাজে হেরােইন ও ফেনসিডিল সব নেশাকে ছাড়িয়ে গেছে । হেরােইন এমনই মারাত্মক শক্তিশালী মাদক যে , কেউ কৌতূহলবশেও যদি এ মাদক গ্রহণ করে তাহলে তা থেকে সে আর মুক্ত হতে পারে না । 

    মাদকাসক্তির কারণ : মাদকাসক্তির পেছনে রয়েছে নানা রকম কারণ । তবে কোনাে একটি নির্দিষ্ট কারণে মানুষ মাদকাসক্ত হয় না । অনেকেই কৌতূহল বশে মাদক গ্রহণ শুরু করলেও পরবর্তীতে এই আসক্তি জীবনের জন্য মারাত্মক অভিশাপ জেনেও এর শৃঙ্খল থেকে বের হতে পারে না । অনেক সময় ব্যক্তিগত , পারিবারিক ও নানাবিধ আর্থসামাজিক পরিস্থিতি মানুষকে এ অভিশপ্ত জীবনের দিকে ঠেলে দেয় । মাদকাসক্তির পেছনে প্রধান যে কারণগুলাে দায়ী তা হলাে : 
    ১.কৌতূহল মেটাতে ; 
    ২.আসক্ত বন্ধু - বান্ধবের চাপে পড়ে ; 
    ৩.পারিবারিক অশান্তির কারণে ;  
    8 . বেকারত্ব ও নিঃসঙ্গতা থেকে ; 
    ৫. নানাবিধ কারণে জীবনে হতাশা ও দুঃখবােধ থেকে ; 
    ৬.পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা , নিয়ন্ত্রণহীনতা থেকে ; 
    ৭.মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ; 
    ৮ . মাদক ব্যবসায়ীদের সংস্পর্শ ; 
    ৯.চিত্তবিনােদনের অভাবে ; 
    ১০. জীবনে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা ; 
    ১১. সাময়িক ভালাে লাগার আকর্ষণ । 
    ১২. প্রেমঘটিত কারণে । আধুনি , মনােবিজ্ঞানীদের মতে , সুস্থ বিনােদনের অভাবে মানুষ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে । 

    মাদকাসক্তির পরিণাম : মাদকাসক্তির পরিণাম তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া । মাদকের নেশায় । আচ্ছন্ন মানুষ নানারকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ে । আসক্ত ব্যক্তির আচার - আচরণে দেখা যায় অস্বাভাবিকত্ব । নানারকম রােগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় এবং রােগ প্রতিরােধ ক্ষমতা কমে যায় । মাদকাসক্ত ব্যক্তির । ভালাে কাজের প্রতি অনীহা ও মন্দ কাজের প্রতি আকর্ষণ ও মূল্যবােধের অবক্ষয় সমাজ জীবনের ওপর । নেতিবাচক প্রভাব ফেলে । একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেহেতু পরিবারের বাইরেও সামাজিক জীবনযাপন । করেন , সেহেতু এর প্রভার ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র আর্থসামাজিক কাঠামাের ওপর পড়ে আর । আসক্তিজনিত কুফলগুলাে দ্বারা পরিবার , সমাজ ও রাষ্ট্র সংক্রমিত হয় । দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় । আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য চোরাচালানকারীদের ব্যবসার জন্য লােভনীয় স্থান এখন এ দেশ । বিশেষভাবে । 


    বাংলাদেশে মাদকাসক্তির প্রভাব : বাংলাদেশে মাদকাসক্তির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । আমাদের যুব সমাজের একটা বিরাট অংশ মারাত্মকভাবে বুকে পড়ছে মাদকের দিকে । এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে । যুবসমাজ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ছে । অসংখ্য মানুষ হৃদরােগ , ফুসফুসে পানি জমা , লিভারের জটিলতা , কিডনি রােগ , অপুষ্টি , ক্ষুধামন্দা , রক্তহীনতা , মস্তিষ্ক বিকৃতি , ক্যান্সার , বন্ধ্যাত্বসহ নানা রকম রােগে ভুগছে মাদকের কারণে । শারীরিক সমস্যার বাইরে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রােগীর সংখ্যাও এ কারণে বেড়ে যাচ্ছে । সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে মানবিক বন্ধন ও শৃঙ্খলতা ভেঙে পড়ছে । সমাজ জীবন ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে । 

    মাদকাসক্তি প্রতিরােধ : মাদকাসক্তি সমাজজীবনে এক নির্মম অভিশাপ । তাই এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বিশ্ব বিবেক আজ সচেতন । বিশ্বের দেশে দেশে সংগঠিত হচ্ছে মাদকবিরােধী আন্দোলন । বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই । সর্বগ্রাসী মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্যে গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ । এগিয়ে এসেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজসেবী সংস্থা । সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে । সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন জেলায় তৈরি করা হয়েছে বেশ কিছু নিরাময় কেন্দ্র । মাদক চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের মতাে কঠোর আইন হয়েছে । মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরােধ গড়ে তােলা এবং মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যেসব বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তা হলাে : 
    ১. মাদকাসক্তদের অবজ্ঞা না করে তাদের শারীরিক এবং মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা ; 
    ২. মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরােধ গড়ে তােলা ; 
    ৩ , ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযােগ সৃষ্টি ; 
    ৪. সুস্থ বিনােদনমূলক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটানাে ; 
    ৫ , মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে গণসচেতনতামূলক প্রচারণার ব্যবস্থা করা ; 
    ৬. মাদকদ্রব্য চোরাচালান রােধ করার জন্যে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে গণআন্দোলন গড়ে তােলা ইত্যাদি । 

    উপসংহার : মাদকের অপশক্তি সবচেয়ে বেশি গ্রাস করছে তরুণ সমাজকে । সুতরাং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের অর্থই হলাে দেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিপর্যস্ত হয়ে পড়া । তাই গ্রহণকাল শুরু হবার আগেই প্রয়ােজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে । মাদকের অপশক্তির বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে ব্যাপক আন্দোলন এ দায়িত্ব পরিবারের , সমাজের , এবং রাষ্টের ।

    মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার / ও আমাদের যুবসমাজ

    Madokashoktir Porinam O Protikar Rochona


    Tag: মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার রচনা - মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার, Madokashoktir Porinam O Protikar Rochona, মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার প্রভাব, মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার প্রভাব ও আমাদের যুবসমাজ, মাদকাসক্তির পরিণাম ও প্রতিকার অনুচ্ছেদ রচনা 
    Previous Post Next Post

    👇 সকল ক্লাসের এসাইনমেন্ট নোটিফিকেশন আকারে সহজে পেতে ডাউনলোড করুন আমাদের এপ্লিকেশন 

    আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত হতে ক্লিক করুন