লাহাের প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট হিসেবে বঙ্গভঙ্গ , মুসলিম লীগ এবং দ্বি - জাতি তত্ত্বের উপর একটি নিবন্ধ লিখ -এইচএসসি /আলিম ২য় সপ্তাহের পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্র এসাইনমেন্ট সমাধান/উত্তর ২০২১

 

এইচএসসি /আলিম ২য় সপ্তাহের পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্র এসাইনমেন্ট সমাধান/উত্তর ২০২১

       
       
              

    এইচএসসি /আলিম ২য় সপ্তাহের পৌরনীতি ও সুশাসন এসাইনমেন্ট সমাধান/উত্তর ২০২১

    লাহাের প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট হিসেবে বঙ্গভঙ্গ , মুসলিম লীগ এবং দ্বি - জাতি তত্ত্বের উপর একটি নিবন্ধ লিখ ।

    উত্তরঃ-

    বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল 

    ভূমিকা :

     ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ই জুন ভগিরতি নদীর তীরে পলাশীর আম বাগানে বাংলা , বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাদ্দৌলার পরাজযের মাধ্যমে এ ভারতীয মহাদেশে ইংরেজদের শাষনের গােড়াপত্তন হয় । তৎকালীন বাংলা , বিহার , উড়িষ্যা , আসাম ও আরাে কিছু অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়েছিল বাংলা প্রেসিডেন্সি । এর আয়তন বিশাল হওযাই পুরাে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে একসাথে শাষন করা ব্রিটিশদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল ৷ ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন ( যার নামে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ) এ অঞ্চলের বড় লাট সাহেব হয়ে আসলে তিনি বাংলাকে বিভাজন করার সিদ্ধান্ত নেন । এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯০৫ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর বঙ্গভঙ্গ করে রাজশাহী , ঢাকা , চট্রগাম ও আসামকে নিয়ে গঠিত করেন পূর্ব বঙ্গ যার রাজধানী হয় ঢাকা ৷ এ সময় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ঢাকার নওয়াব সলিমুল্লাহ সহ অনেক মুসলিম নেত্রিবৃন্দের সমর্থন লাভ করেন যদিও হিন্দুরা এর ঘাের বিরােধিতা করেছিল ।

     বঙ্গভঙ্গের কারণ : 

    বঙ্গভঙ্গের মূল যে কারণ তা হল , বাংলা প্রেসিডেন্সির বিশাল আয়তন হওয়ার কারণে ব্রিটিশরা এদেশেকে শাসন - শুষনে বেশি সুবিধা করতে পারছে না । অপরদিকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেওয়া ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ( আই.এন.সি ) ব্রিটিশ বিরােধী বিভিন্ন কার্যকলাপকে থামিয়ে দিতে বাংলাকে বিভাজন করার প্রয়ােজন মনে করেন । এর পরেও বঙ্গভঙ্গের পেছনে আরাে সুদূর প্রসারি কারণ আছে যা নিচে উল্লেখ করা হল ..... 

    প্রশাসনিক কারণ ; রাষ্ট্রবিজ্ঞানিগণ মনে করেন বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ হল প্রশাসনিক কারণ । বাংলা ছিল বিশাল প্রদেশ যার আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল । ফলে শাসনভার ছিল কষ্টসাধ্য । লর্ড কার্জন প্রথম থেকেই একে প্রশাসনিক সংস্কার নামে অভিহিত করেন । 

    কংগ্রেসকে দুর্বল করা : ১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় জনগনের সচেতনতা বৃদ্ধি পায় । শুরু থেকেই ব্রিটিস বিরােধীভাবাপন্ন হলেও বঙ্গভঙ্গ যথন প্রস্তাব হয় কংগ্রেস তখন থেকেই এর বিরােধিতা করেন । কার্জন বিশ্বাস করতাে কলকাতায় কিছু ষড়যন্ত্রকারী আমার বক্তব্য কংগ্রেসে চালাতাে । কাজেই কলকাতার গুরুত্ব হ্রাস করে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করলে । ষড়যন্ত্রকারীরা সে সুযােগ আর পাবে না । তারা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে । 

    অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ : ব্রিটিশ সরকারের যতাে উন্নয়ন সব হতাে ভারতের রাজধানী কেন্দ্রীক । তুলনামূলকভাবে পূর্ব বংলার জনগণ অবহেলিত হতাে । যেহেতু এ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম তাই মুসলিমরা হিন্দুদের তুলনায় সুযােগ সুবিধা কম পেত । তাই দুই বাংলার মানুষ বিশেষকরে মুসলিমরাও যাতে তাদের প্রয়ােজনীয় সুযােগ - সুবিধা পায় সেজন্যই মূলত বাঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । 

    সরকারি চাকরিতে সমস্য : সে সমযের হিন্দুরাই সবচেয়ে বেশি সরকারি চাকরির সুবিধা পেত । এক্ষেত্রে মুসলিমরা ছিল পিছিয়ে । মুসলিমরা যাতে সমানভাবে সরকারি চাকরি করতে পারে এ জন্য বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । আর বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হ্য । ঢাকার নওয়াব সলিমুল্লাহ সহ প্রায় সব মুসলিম নেতাগণ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল ৷ 

    পাটের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্য : পূর্ব বাংলায় পাট উৎপাদন হতাে বেশি কিন্তু পাটকল ছিল না । পাটকল ছিল কলকাতায় ও হুগলিতে । এ জন্য পূর্ববাংলার জনগণ পাটের উপযােক্ত মূল্য পেত না । এ জন্য পূর্ব বাংলার জনগন বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিল । আর পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতেই বঙ্গভঙ্গ করা হয়েছিল । 

    বঙ্গভঙ্গের ফলাফল : 

    বঙ্গভঙ্গ যে লক্ষ্যে করা হয় তার পুরােপুরি বাস্তবায়তি হয় নি বা হতে দেইনি তৎকালীন হিন্দু শ্রেণি বা হিন্দু নেত্রীবর্গ । বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের শুরুতে এর বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ , বাংলা পত্রপত্রিকা , ভারত ও ইংল্যান্ডের ইংরেজি পত্রিকাগুলাে প্রতিবাদ করে | ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহকে ইংরেজরা স্বপক্ষে আনতে সক্ষম হলেও , বাংলার সমগ্র মুসলমান সমাজকে আনতে পারে নাই । ১৯০৫ সালের জুলাই মাসের ভিতরে এই আন্দোলনে স্থানীয় জমিদার এবং সাধারণ প্রজাদের সাথে চরমপন্থী দলগুলােও শরিক হয়ে উঠে । ১৯০৫ সালের ১৭ ই জুলাই খুলনাতে এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ ব্রিটিশ পণ্য ব্যকটের প্রস্তাব গৃহীত হয় । ক্রমান্বয়ে এই আন্দোলন ব্রিটিশ - বিরােধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ লাভ করে । এই সময় ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে । এক্ষেত্রে ব্রিটিশ বিভেদ নীতি দিয়ে মুসলমানদেরকে এই আন্দোলন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে , ব্রিটিশরা ব্যর্থ হয় । 

    – ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার রাজাবাজারে মুসলমানদের এক বিরাট সভায় এই আন্দোলনের পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করা হয় । ক্রমান্বয়ে এই আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠলে ব্রিটিশ সরকার কার্লাইল সার্কুলার জারি করে ছাত্রদের সভাসমিতি হরতাল নিষিদ্ধ করা হয় । এর প্রতিবাদে বাংলার যুবসমাজ নভেম্বর মাসে এ্যান্টি - কার্লাইল সার্কুলার সােসাইটি গঠন করে । অবশেষে ১৯১১ খ্রিস্টব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় ।

     মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব 

    মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা : 

    ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলেও মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয় নি । তাই মুসলমানদের অধিকাংশ নেতাই কংগ্রেসে যােগদান থেকে বিরত থেকে বিভিন্ন সভা - সমিতি গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে । বিভিন্ন সভা - সমিতি মুসলমানদেরকে সচেতন করে এবং ইংরেজি শিক্ষার দিকে মুসলমানদেরকে ঝুঁকতে সাহায্য করে । বঙ্গভঙ্গরদে যখন কংগ্রেস নেতারা সােচ্চার , তখনই ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বরে লঞ্চেীতে মুসলমান নেতৃবৃন্দ স্যার আবদুর রহিমের নেতৃত্বে দাবিদাওয়ার খসড়া স্মারকলিপি তৈরি করেন । ৩৫ সদস্যের মুসলিম প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আগা খানের নেতৃত্বে লর্ড মিন্টোর সিমলা ডেপুটেশন হয় । ডেপুটেশনের দাবিদাওয়া লর্ড মিন্টো বিবেচনার আশ্বাস প্রদান করলেও বিশ্ববিদ্যালয় , সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং হাইকোর্টগুলােতে নিয়ােগ ইত্যাদি বিষযে লর্ড মিন্টো নীরব ভূমিকা পালন করেন । এই নীরবতাই একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তাকে অপরিহার্য করে তুলে । কয়েক মাস পর ঢাকায় অনুষ্ঠিত শিক্ষ সম্মেলনে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সিমলা ডেপুটেশন থেকেই গ্রহণ করা হয় । ১৯০৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকায় শিক্ষা সম্মেলন শুরু হয়ে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ অধিবেশন চলে । শিক্ষা সম্মেলনের রাজনৈতিক অধিবেশনে ভিকার - উল মুলকের সভাপতিত্বে অধিবেশনের মূল বক্তা নবাব সলিমুল্লাহ - এর প্রস্তাবে এবং হাকিম আজমল খানের সমর্থনে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠিত হয় ।

    মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও তাৎপর্য : 

    ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনাকারী ঘটনা হলাে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা । মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা একদিকে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্লাটফর্ম আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক , সামাজিক , সাংস্কৃতিক শিক্ষাক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠার কারক হিসেবে মুসলমানদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনয়ন করে । নিম্নে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও ভাৎপর্য আলােচনা করা হলাে 

    ১. মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি : কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মুসলমানদেরকে অবহেলার চোখে বিবেচনা করে নির্যাতন অব্যাহত রাখা হয়েছিল | এভাবে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ও ব্রিটিশ সরকারই উভয় শ্রেণির মিলিত তৎপরতায় মুসলমান নেতৃবৃন্দকে কংগ্রেসে যােগদান থেকে বিরত রাখে এবং বঙ্গভঙ্গকে মুসলমানদের স্বার্থের অনুকূলে বিবেচনা করে মুসলমানরা পক্ষে অবস্থা নেয় । এভাবেই মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুসলমানদেরকে তাদের স্বার্থ ও অধিকার । সম্পর্কে সচেতন করে তােলে । 

    ২. মুসলমানদের আত্মজাগরণ সৃষ্টি : বঙ্গভঙ্গ ঘােষণার পর কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ মনে করে এর বিরােধিতা ও রদ করার চেষ্টা চালায় । অপরদিকে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে মুসলমানদের স্বার্থের অনুকূলে মনে করে এর পক্ষে অবস্থান নেয় । মুসলমানদের আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং দাবি ও অধিকার আদায়ের জন্য সুসংগঠিত হতে থাকে । যার ফলে মুসলিম লীগ মুসলমানদের মধ্যে আত্মজাগরণের সৃষ্টি করে ব্রিটিশ সরকারকে বঙ্গভঙ্গ রদ না করার পক্ষে চাপ প্রয়ােগ করেছে । 

    ৩.মুসলমানদের সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ : মুসলমানদের মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পূর্বে কোনাে রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না । মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুসলমানরা রাজলৈভিক অসচেতন ও রাজনৈতিক অনীহা থাকলেও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক সচেতন করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তােলে । এছাড়া বিভিন্ন দাবিদাওয়া ও অধিকার আদায় নিয়ে ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সাথে দেন - দরবার এই অগ্রহকে অতিমাত্রায় বৃদ্ধি করে । এভাবে মুসলমানদেরকে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের সুযােগ সৃষ্টি করে দিয়েছে মুসলিম লীগ । 

    ৪ , মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি - দাওয়া উপস্থাপন : মুসলমানদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া সম্পর্কে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পূর্বে ব্রিটিশ সরকারকে অবগত করার জন্য স্মারকলিপি ও চিঠিপত্র আবার কখনাে কখনাে কংগ্রেসের পিছনে দৌড়াতে হতো । কিন্তু মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর এসবের পরিবর্তে মুসলমানদের দাবি - দাওয়া সরাসরি মুসলিম লীগের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হয় । ফলে পূর্বের চেয়ে ব্রিটিশ সরকার মুসলমালদের ব্যাপারে অধিক সচেতন হয়ে ওঠে । 

    ৫. হিন্দু - মুসলমান বিবাধাকে স্থায়ীরূপ দান : হিন্দু নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকে বাঁকা চোখে দেখে পি ও কটাক্ষ করেছে । এই নীতি মুসলমানদেকে মুসলিম লীগের পতাকা তলে আর হিন্দুদেরকে কংগ্রেসের পতাকা তুলে নেওযার মাধ্যমে সমগ্র ভারতে হিন্দু - মুসলমান সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিয়েছে । যার ফলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রবল রূপ নেয় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয় । 

    ৬. পৃথক নির্বাচনের স্বীকৃতি : ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করে পৌরসভা , জেলা বাের্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেট ও সিন্ডিকেট মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ক্ষন এবং জনসংখ্যার অনুপাতে নয় বরং রাজনৈতিক গুরুত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য প্রাদেশিক কাউন্সিল নির্বাচনের দাবি জানানো  হযেছিল । এই দাবির ধারাবাহিকতায় ১৯০৯ সালে মলি - মিন্টো সংস্কারের অধীনে ব্রিটিশ সরকার পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নিয়েছিল । এই দাবি মেনে নেওয়ার পিছলে মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনস্বীকার্য ।

     ৭. দ্বিজাতি তত্ব ও লাহাের প্রস্তাব : হিন্দু - মুসলিম তিক্ততা বৃদ্ধি পেতে থাকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এবং বিশ্বাস অবিশ্বাসের পাল্লাটাও ঝুলতে থাকে । মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলমানরা অধিক রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ওঠে এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুসলমানদের সমর্থক সংখ্যা বৃদ্ধি পায় । কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারকে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য করলেও মুসলিম লীগ এর বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তােলে । প্রথমদিকে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব সফল না হলেও ১৯৪০ সালে লাহাের প্রস্তাবের পর কংগ্রেস বিরােধী আন্দোলন চাঙ্গা হ্য । হিন্দু - মুসলিম দ্বন্দ্বের তিক্ততার মধ্যেও মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ' দ্বিজাতি ত ' উপস্থাপন করলে এটা মুসলিম লীগের দাবি হিসেবে ব্যাপক সমর্থন লাভ করে , যার কারণে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায় ।

     লাহাের প্রস্তাবের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব / তাৎপর্য 

    ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহােরে নিখিল ভারত মুসলিমলীগের অধিবেশনে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক “ লাহাের প্রস্তাব পেশ করেন । বিপুল পরিমাণ উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিযে ২৪ মার্চ প্রস্তাবটি গৃহীত হয় । নিচে লাহাের প্রস্তাবের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ দেওয়া হলাে : 

    ০১। ভৌগােলিক দিক থেকে সংলগ্ন এলাকাগুলােকে পৃথক অঞ্চল বলে গণ্য করতে হবে । 

    ০২। উত্তর - পশ্চিম ও পূর্ব ভারতের সমস্ত অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সমন্বয়ে একাধিক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রগঠন করতে হবে । এবং এ সমস্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হবে সার্বভৌম ও স্বায়ত্তশাসিত । 

    ০৩। ভারতের ও নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক , শাসনতান্ত্রিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা করা হবে । অর্থাৎ , সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার সার্বিক ব্যবস্থা সংবিধানে থাকতে হবে । 

    ০৪। দেশের যেকোনাে ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনায় উক্ত বিষয়গুলােকে মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে ।

    লাহাের প্রস্তাবের গুরুত্ব : 

    ১৯৪০ সালের লাহাের প্রস্তাব পূর্ব - পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । এ প্রস্তাবের মাধ্যমে শােষিত , উপেক্ষিত এক বৃহৎ জনগােষ্ঠীর স্বাধীনতার প্রয়ােজনীয়তা স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উঠে আসে । মূলত লাহাের প্রস্তাবের পর থেকেই ভারভীয় উপমহাদেশের পট - পরিবর্তন শুরু হয় । নিচে লাহাের প্রস্তাবের গুরুত্ব আলােচনা করা হলাে : 

    ০১। দ্বিজাতি তত্বের সূচনা : ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সংখ্যালঘু মুসলমানরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের স্বীকার হয় । এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য লাহাের প্রস্তাবে “ এক জাতি , এক রাষ্ট্র নীতির দাবি করা হয় । দবির মূল কথাই হলাে হিন্দুদের জন্য একটি রাষ্ট্র এবং মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করতে হবে । এ নীতির প্রেক্ষিতেই মােহম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্বের ঘােষণা দেন । 

    ০২। স্বাধীন বাংলাদেশের রূপবেখা : লাহাের প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলাে পর্যালােচনা করলে দেখা যায় , বাংলার বাঘ এ.কে. ফজলুল হক বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পথ সুগম করতে চেয়েছিলেন । লাহাের প্রস্তাব পাশ হলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্য নতুন স্বপ্নের সৃষ্টি হয় । যা ইংরেজদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্খা প্রকাশ পায় । 

    ০৩ মুসলমানদের স্বতন্ত্র স্বীকৃতি : ইংরেজ আমল শুরু হওয়ার পর থেকেই ভারতীয় মুসলমানদের আধিপত্য হ্রাস পেতে থাকে । মুসলমানরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে বাস করা শুরু করে । তাদের মধ্যে এই উপলদ্ধি হয় যে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে থাকবে । এই প্রেক্ষিতে লাহাের প্রস্তাব উত্থাপিত হলে মুসলমানদের মধ্যে স্বতন্ত্র জাতিসম্বর উপলব্ধি ঘটে । যা স্বাধীন পাকিস্তান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । 

    ০৪। ভারত ও পাকিস্তানের সৃষ্টি : লাহাের প্রস্তাবে ভারতীয় উপমহাদেশকে ভেঙ্গে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয় । এর প্রেক্ষিতে হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হ্য । মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিযে ১৫ আগষ্ট ভারত রাষ্ট্রের সৃষ্টি হ্য । 

    ০৫। মুসলিম জাতিয়তাবাদের উন্মষ : লাহাের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদ তীব্র আকার ধারণ করে এবং বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে মনবিলে মকসুদের দিকে এগিয়ে যায় । ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ মুসলিম জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । 

    দ্বিজাতিতম্বের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব তাৎপর্য

     দ্বিজাতিতষ্কের অর্থ হল দুটি জাতির জন্য আলাদা আলাদা তত্ব । অর্থাৎ ভারতে হিন্দু ও মুসলমান যে দুটি আলাদা জাতি , সেই ধারণার রূপায়ণ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব উনিশ শতকের প্রথমভাগ থেকেই হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায় সমাজে আলাদা আলাদাভাবে নিজেদের অবস্থানকে দৃঢ় করতে চাইলে এই তত্ত্বের অবতারণা ঘটে । এ প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহরু বলেছেন । একথা ভুললে চলবে না যে ভারতে সাম্প্রদায়িকতা পরবর্তীকালের বৈশিষ্ট্য – আমাদের চোখের সামনেই তা সৃষ্টি হয়েছে। 

    পাকিস্তান আন্দোলনে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রভাব 

    জিন্নাহর ' দ্বিজাতি তত্ত্ব ছিল ১৯৪০ সালের লাহাের প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাবের মূলভিত্তি । যদিও লাহাের প্রস্তাবে ‘ পাকিস্তান কিংবা ‘ দ্বিজাতি তত্ত্বের কথা উল্লেখ ছিল না । 

    ধর্ম এক হলেই এক জাতি হয় না - বাংলাদেশের অভ্যুদয় এর বড় প্রমাণ । তাই বলা চলে , জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্ব ছিল বিকৃত ও অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তকর তত্ত্ব । এটি ছিল সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্টতত্ত্ব । বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ হিসেবে পরিচিত । জাতি গঠনে যে একই ভাষাভাষী , গােষ্ঠীভুক্ত ও রক্ত - সম্বন্ধের অধিকারী হতে হয় তাও নয় । ভারত , মালয়েশিয়া , সুইজারল্যান্ড , কানাডা এর উদাহরণ । জাতিসত্তা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাসকারী জনগােষ্ঠীর এক অভিন্ন ইতিবাচক সচেতনতা , একই রাষ্ট্রীয় কাঠামােয় বসবাসের ইচছা এর প্রকাশিত রূপ । 

    জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর রচিত ছিল না । তা ছিল প্রধানত , অখন্ড ভারতে অনিবার্য হিন্দু এলিট গােষ্ঠী আধিপত্যের স্থলে ভারত বিভক্তি এবং আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ থেকে স্থায়ী পরিত্রাণের লক্ষ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ , কৃষ্টি , ভাষা , অঞ্চল ও ঐতিহ্যে বিভক্ত ভারতীয় মুসলমানদেরকে একই পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি ভিত্তি । ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানদের প্রতি ইংরেজ সরকার সন্দিহান থাকে । মুসলমানরাও দীর্ঘসময় অসহযােগিতার নীতি অনুসরণ করে । ফলে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে বা উপেক্ষিত থাকে । অবিভক্ত ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়ের স্থায়ী অধিপত্যের ভীতি মুসলমানদেরকে শঙ্কিত করে তােলে । ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সরকার গঠন , হিন্দু অধিপত্যের বহিঃ প্রকাশ প্রভৃতি ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রচন্ডভাবে ভাবিয়ে তােলে ।

    এমতাবস্থায় জিন্নাহ তাঁর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতের বিভক্তি ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করলে তা ভারতীয় মুসলমানদের চেতনামূলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয় । পৃথক আবাসভূমি বা স্বাধীনতার স্বপ্ন তাদেরকে জাগিয়ে তােলে । পাকিস্তান আন্দোলন অপ্রতিরােধ্য হয়ে দাঁড়ায় । পাকিস্তান ইস্যুতে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিপুল সাফল্য অর্জন করে । নির্বাচনােত্তর ব্রিটিশ সরকার ভারতে একটি মন্ত্রী মিশন প্রেরণ করে অত্যন্ত শিথিল বন্ধনীর মধ্যে ভারতকে অখন্ডিত রাখার সর্বশেষ চেষ্টা করে । কিন্তু তা সফল হয় নি । অবশেষে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয় । প্রতিষ্ঠালাভ করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র , ভারত ও পাকিস্তান ।


    Tag:লাহাের প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট হিসেবে বঙ্গভঙ্গ , মুসলিম লীগ এবং দ্বি - জাতি তত্ত্বের উপর একটি নিবন্ধ লিখ, এইচএসসি /আলিম ২য় সপ্তাহের পৌরনীতি ও সুশাসন ২য় পত্র এসাইনমেন্ট সমাধান/উত্তর ২০২১


    Previous Post Next Post

    👇 সকল ক্লাসের এসাইনমেন্ট নোটিফিকেশন আকারে সহজে পেতে ডাউনলোড করুন আমাদের এপ্লিকেশন 

    আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত হতে ক্লিক করুন