বঙ্গবাণী কবিতার আলােকে মাতৃভাষার গুরুত্ব মূল্যায়ন


    বঙ্গবাণী কবিতার আলােকে মাতৃভাষার গুরুত্ব মূল্যায়ন


    ১. নম্বর প্রশ্ন কবি আব্দুল হাকিমের মাতৃভাষা গ্রন্থ রচনা কারণ । 

    উত্তর : কবি সাধারণ মানুষকে সাহিত্য পাঠের সুযােগ করে দেওয়ার জন্য কাব্য রচনা করেছেন।যে ভাষা সাধারণের বােধগম্য নয় , সে ভাষায় সাহিত্য রচনায় করলে তা তারা বুঝতে পারে না । ফলে তারা সাহিত্যপাঠে আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় । তৎকালীন সময়ে আরবি - ফারসি ভাষায় পুস্তক রচিত হতাে বলে তা সাধারন মানুষ বুঝতে পারত না । কবি এ সকল সাধারণ মানুষের জন্য মাতৃভাষায় কাব্য রচনা করেছেন যাতে তারাও সাহিত্য পাঠ করতে পারে । বাংলাভাষী মানুষের জন্য বাংলায়গ্রন্থ রচনাই উত্তম বলে মনে করেন । সাহিত্য রচনা করে লেখক সাধারণ মানুষের সাথে নিজ নিজ মনের সংযােগ ঘটান । সাহিত্য রচনার ভাষা সাধারণের বােধগম্য না হয় তবে মনের সংযোেগ সম্ভব নয় । কবির মতে , সাধারণ মানুষের জন্য মাতৃ ভাষায় রচিত কাব্য সবচেয়ে উপযােগী । এ কারণেই তিনি মাতৃভাষা তথা বাংলায় কাব্য রচনা করায় মনােনিবেশ করেছেন । 

    ২. নম্বর প্রশ্ন । মাতৃভাষা বিদ্বেষীদের প্রতি কবির মনােভাব । 

    উত্তর : কবি বাংলা ভাষা বিদ্বেষীদের দেশ ত্যাগ করার উপদেশ দিয়েছেন । অনেক মানুষই আছে , যারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে অথচ বাংলা ভাষার প্রতি তাদের কোন মমতা নেই । এদের বংশ ও জন্ম পরিচয় সম্পর্কে কবির মনে সন্দেহ জাগে । এসব মাতৃভাষা বিদ্বেষীদের প্রতি কবি প্রচণ্ড ক্ষোভ । তাই তিনি সখেদে বলেছেন , এসব মানুষের নিজ দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যা উচিত । কারণ এদের স্বদেশ এবং স্বভাষার প্রতি মমত্ববােধ নেই বলে কবি দাবি করেন । স্বদেশে থেকে যারা স্বদেশের প্রতি বীতরাগ তারা প্রকৃতপক্ষে দেশ ও দেশের ভাষার প্রতি মমত্বহীন । তাদের এরূপ হীন মনােভাব লক্ষ্য করে ব্যথিত হয়েছেন কবি । শিকড়হীন পরগাছা প্রকৃতির এসব মানুষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করতেই তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে তাদের দেশ ত্যাগের উপদেশ দিয়েছেন । 


    ৩ নম্বর প্রশ্ন । সাধারণ কথােপকথন , বইপত্র , সাইনবাের্ড , ব্যানার , সংবাদ ও গণমাধ্যম ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভাষার অপপ্রয়ােগের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত উপস্থাপনা ( প্রয়ােজনে ছবি , পেপার কাটিং সংযুক্ত করা ) 

    উত্তর : মায়ের ভাষায় ভাব প্রকাশের অধিকার আদায় বুকের তাজা রক্ত দেওয়ার নজির কেবল বাংলাদেশেই আছে।ভাষা হিসেবেও সেই গৌরব বয়ে বেড়াতে পারছে বাংলা । এত ত্যাগ তিতিক্ষা তবুও দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষা এখন পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি । মাতৃভাষা ব্যবহারে দক্ষিণ কোরিয়া অন্যদের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে । দেশটির নাগরিকরা জীবনের প্রতিটি পরতে যেন পরম মমতায় অনুভব করেছেন নিজেদের মাতৃভাষাকে ।


    সাধারণ কথােপকথন 

    বাংলা ভাষার চরম বিকৃত হয়েছে সাধারণ কথােপকথন এর মাধ্যমে।কথায় আছে এক দেশের বুলি অন্য দেশের গালি । এক অঞ্চলের ভাষা কোন অঞ্চলের মানুষ সহজে বুঝতে পারে না । অথচ একই দেশে বসবাস করি । বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করলে দেখা যায় মাতৃভাষার বিভিন্ন রূপ । আজ বাংলা ভাষাতে হিন্দি , নেপালি , তিব্বতীয় ও ইংরেজি ভাষার সংমিশ্রণ । যার প্রভাবে আসল মাতৃভাষার শব্দগুলাে এখন বিলুপ্তির পথে । 

    বইপত্র 

    বর্তমানে বিভিন্ন উপন্যাস ও কবিতায় বিভিন্ন বিদেশি শব্দের সংমিশ্রণ দেখা যায় । এছাড়াও এসব পাঠ্যপুস্তকে বানানে ব্যাকরণ রীতি অনুসরণ করা হয় না । মানুষ বানান এখন লেখা হয় মানুস । পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার বানান এখন আমাদের ভাষায় প্রবেশ করেছে যা আমাদের কাম্য নয় । বিদেশি ভাষার প্রভাবে আমাদের দেশীয় ভাষার শব্দগুলাে বইপত্রে কমই দেখা যায় । 

    সাইনবাের্ডে 

    বাংলা আমাদের মাতৃভাষা , মায়ের ভাষা । সেই ভাষায় আমরা সবাই কম বেশি ভুল করি । কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাজে এ ধরনের ভুল সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত । বানান ভুলের কারণে কুড়িল উড়ালসেতু এখন ভাজা সেতুর অর্থ বহন করে । দৃষ্টিনন্দন কুড়িল ফ্লাইওভারের একদিকে সাইনবাের্ডে ফ্লাইওভারের বদলে লেখা হয়েছে ফ্রাই ওভার । এর সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়তাে এই ফ্লাইওভারের ঘিরে অন্যান্য বাের্ডেও চলছে ভুল বানানের উৎসব । দেশের চারদিকে ছড়ানাে বিভিন্ন ফ্লাইওভারের দিক নির্দেশক সাইনবাের্ড গুলাে এমনভাবে ভুল বানানে দাঁড়িয়েছে যা দেখে অবাক হওয়ার সঙ্গে , লজ্জাও পেতে হয় । চারিদিকেই ভুল বানানের ছড়াছড়ি । ২০ থেকে ৩০ গজের মধ্যে একেক বানান একেক রকম । স্বরণি লেখা সাইনবাের্ড সত্যি স্মরণীয় হয়ে থাকার মতাে । 

    ব্যানার 

    ব্যানারে বাংলা ভাষার ব্যবহার দেখলে চোখ কপালে ওঠার মতন । যারা ব্যানার লেখেন তারা না জানে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রীতি না জানে ভাষার সঠিক অর্থ প্রতিদিন সকালবেলা রাস্তায় বের হলে বিভিন্ন স্থানে ঝুলিয়ে থাকে বিভিন্ন রঙের ব্যানার । এই ব্যানানের ভাষার বানান দেখলে মনে হয় না যে এগুলাে বাংলা ভাষার শব্দ । ব্যানারের বিভিন্ন বিদেশি শব্দ পাশাপাশি বাংলা শব্দগুলাে বাংলায় লেখা হয় । যা দেখে মনে হয় যে বিদেশি ভাষার শব্দগুলাে বাংলা ভাষার সন্তান । যাহা এইমাত্র জন্ম গ্রহণ করলাে । 

    সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম 

    তবে আমাদের মাতৃভাষা নিয়ে আরেকটি সমস্যা প্রকট হয়েছে । সেটা হল- বাংলা সাথে ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ভাষার তৈরি । এছাড়াও ইংরেজি শব্দগুলাে এখন বাংলা শব্দ পরিণত হয়েছে যেমন মােবাইল , ফোন এফএম রেডিও , টেলিভিশন ইত্যাদি । আমাদের দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে হাতেগােনা কয়েকটির নাম বাংলায় বাকিগুলাে ইংরেজিতে । এই নামগুলাে দেখে বােঝার উপায় নাই যে এগুলাে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় । এছাড়াও বাংলা ভাষার অপব্যবহার বিভিন্ন সাহিত্যে , চলচ্চিত্রে , নাটকে , গানে , সংবাদপত্রে দেখা যায় । কিছু দেশীয় সংবাদপত্রগুলাে বানান রীতি অনুসরণ করলেও স্থানীয় পত্রিকাগুন [ তাদের ইচ্ছামত ভাষার শব্দ ও বানান লিখতে দেখা যায় । যা সবার কাছে বােধগম্য নয় । এছাড়াও বাংলা ভাষার অপব্যবহার আরাে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যেমন সরকারি ও বেসরকারি অফিস আদালতে ।


    4. নম্বর প্রশ্নের উত্তর মাতৃ ভাষার অপপ্রয়ােগ কমাতে এবং যথাযথ প্রযোেগ বাড়াতে একক বা দলগতভাবে কী ধরনের ভূমিকা রাখা যায় এ বিষয়ক একটি পরিকল্পনা তৈরি করা 

    উত্তর : ভাষাকে বাঁচাতে হলে , ভাষা মর্যাদা ও অধিকারকে সমুন্নত রাখতে গেলে সর্বাগ্রে প্রয়ােজন ভাষা পরিকল্পনা।আর এর সঙ্গে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে সামাজিক- ভাষিক অবস্থিতিবােধ । ভাষার ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষা ছাড়া জাতীয় সামূহিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় । যে ভাষা নতুন অর্থ প্রদান করতে সক্ষম , যে ভাষা মানুষের বাসনাকে ধারণ করে , যে ভাষা নতুন- জাগা ও প্রজ্ঞাকে প্রকাশ করে চিন্তা ও যাপন কে মিলাতে পারে , সে ভাষার লালন প্রাসঙ্গিক । ভাষা , জাতীয়তা এবং রাষ্ট্র কিভাবে পরস্পর অন্বিত হয়ে একটি অনিবার্য পরিণতির দিকে ধাবিত হয় । অন্যদিকে অফিস - আদালত কর্মক্ষেত্র ব্যবহারিক বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়ােগ নিশ্চিত করার জন্য দরকার সরকারি আগ্রহ- উদ্যোগ । সরকারি বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পণ্যের বিজ্ঞাপনে ভাষা প্রয়ােগের ক্ষেত্রে অসচেতনতা বা ইচ্ছে করে ভাষার অপপ্রয়ােগ এর প্রবণতা পরিহার করতে হবে । সর্বজনীন বাংলা ভাষার প্রয়ােগে আইন প্রয়ােগের পাশাপাশি প্রত্যেক শিক্ষিত নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে । তবেই শহীদের রক্তে অর্জিত মাতৃভাষা সবার মাঝে আজীবন লালিত হবে ।



    Previous Post Next Post

    👇 সকল ক্লাসের এসাইনমেন্ট নোটিফিকেশন আকারে সহজে পেতে ডাউনলোড করুন আমাদের এপ্লিকেশন 

    আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত হতে ক্লিক করুন