পজিটিভ থটস by জান্নাতুল নাঈম পিয়াল | Positive Thoughts Pdf | পজিটিভ থটস বই PDF

 পজিটিভ থটস by জান্নাতুল নাঈম পিয়াল

২০১৫ সাল। হোস্টেল ছেড়ে প্রথম ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করেছি। রান্নাবাড়ার জন্য এক খালাকে রাখা হয়েছে৷ বয়স ৬০ এর মতো। একদিন সন্ধ্যায় রান্না হয়ে যাওয়ার পরও দেখি খালা বসে আছে। কিছুক্ষণ পর আমার রুমের সামনে এসে ইতস্তত করে বলল, ‘আপনার সাথে একটু কথা আছে।’ মিথ্যা বলব না, আমি ভেবেছি হয়তো টাকা চাইবে। কারণ তখনো আমার ধারণা যেকোনো কাজের গূঢ় অভিসন্ধি একমাত্র টাকা। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে, খালা খুব সন্তর্পণে একটা প্লাস্টিকের বক্স বের করল। সেই বক্সে এক টুকরো কেক আর এক স্লাইস পিৎজা। বক্সটা আমার হাতে দিয়ে খালা বলল, ‘অন্য যে বাসায় কাজ করি সেখানের বাচ্চাটার আজকে জন্মদিন। এগুলো দিল আমাকে। আপনি খান।’ আমি বললাম, ‘না না, আপনাকে দিছে, আপনি খান।‘ জবাবে সে খুব জোরের সাথে বলল, ‘আমি আপনার কথা মনে করেই আনছি। আপনি আমার সামনে বসে তাড়াতাড়ি খান। একটু পরেই অন্যরা চলে আসবে।’ ওই ফ্ল্যাটে একমাসই ছিলাম। ফ্ল্যাট ছাড়ার পর আর কখনো খালার সাথে দেখা হয়নি।

হোস্টেলে যখন থাকতাম, তখন হোস্টেলের পাশেই এক হোটেলে সকালে আর রাতে খেতাম। রাতে খেতে যেতে অনেক দেরি হয়ে যেত। প্রথম প্রথম গিয়ে কিছুই থাকত না। কিন্তু হঠাৎ একদিন থেকে দেখি রাত সাড়ে বারোটা-একটার সময়ও খেতে গেলে ভাত, মুরগি, ডাল সব থাকে। একদিন এমন পৌনে একটার দিকে খাচ্ছি। ওয়েটার এসে সামনের চেয়ারে বসে বলল, ‘আপনি আরেকটু আগে এসে খেয়ে যেতে পারেন না? প্রতিদিন অন্তত চার-পাঁচজন কাস্টোমাররে ফিরায় দিতে হয় আপনার জন্য ভাত-তরকারি রাখতে।’ এরকম কিছুর জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। বেশ খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘কোনো কোনো দিন তো আমি খেতে আসিই না। সেসব দিন ভাত-তরকারির কী হয়?’ সে হাত নেড়ে বলল, ‘কী আর হবে!’ একদিন থেকে হঠাৎ দেখি ওই ওয়েটার আর নেই। এরকম কয়েকদিন যাওয়ার পর হোটেলের ক্যাশিয়ারকে জিজ্ঞেস করতে জানায়, মেয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করায় সে গ্রামে চলে গেছে। আর কোনোদিন তাকে দেখিনি।


একবার রমজান মাস। রোজার প্রথম দিনই আমার প্রচণ্ড জ্বর। ইফতারির একটু আগে এক দোকান থেকে পানি আর শুকনো কিছু কিনতে গিয়েছি। দোকানদার আমাকে দেখে বলল, ‘আপনাকে দেখেই তো অনেক অসুস্থ মনে হচ্ছে। জ্বর নাকি?’ আমি মাথা নাড়া সত্ত্বেও আমাকে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমরা ইফতার করব এখন। আপনিও আমাদের সাথে করেন। আর যতদিন জ্বর না যায়, আমাদের এখানেই ইফতার করবেন। সেহেরির সময় তো কিছু খোলা পাবেন না। পাউরুটি-কলা নিয়ে যাবেন এখনই সাথে করে।’ এরপর রোজার মধ্যে যে কয়দিন ঢাকায় ছিলাম, প্রতিদিন ওই দোকানদার জোর করে ডেকে নিয়ে যেত ইফতারির সময়ে। তারপর বাগেরহাটে চলে গেলাম ছুটিতে। ঈদের পর ফিরে দেখি ওই দোকান আর নেই। দোকানের ঘরটাই ভেঙে ফেলা হয়েছে। ওই দোকানদারকেও পরে কখনো দেখিনি।


একবার এক বাসায় থাকি, সেটার নিচে কোল্যাপসিবল গেট। ভোরবেলা তালা দেয়া থাকে। চাবি শুধু কেয়ারটেকারের কাছে। কেয়ারটেকার থাকে ছাদে। তো, একদিন আমার ভোর ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় বেরোনো দরকার। আগেরদিন রাতেই কেয়ারটেকারকে বলে রেখেছিলাম আমি কিন্তু ভোরবেলা বেরোবো। তারপরও অনেক অস্বস্তি হচ্ছিল, এত ভোরবেলা একটা মানুষকে সেই ছাদ থেকে নিচে পর্যন্ত নামাব তালা খুলে দেয়ার জন্য। কিন্তু পরদিন ভোর ৫টা ২৫-এ বের হয়েই দেখি, ফ্ল্যাটের দরজার সামনে কেয়ারটেকার দাঁড়িয়ে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি এখানে?’ সে বলল, ‘আপনি না বলে রাখলেন সাড়ে পাঁচটায় বেরোবেন। তাই আগে থেকে এসে দাঁড়াইছি। আপনি এই প্রথম একটা রিকোয়েস্ট করছেন, সেইটা রাখতে না পারলে কি হয়!’ ওই বাসাও কিছুদিন পরই ছেড়ে দিই। তারপর প্রায় চার বছর হয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য, ওই লোক কোথায় আছে, কেমন আছে, তা-ও এখন আর জানি না।


এই যে উদাহরণগুলো দিলাম, এর সবগুলোই আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা। এবং আমার বয়স তো এখনো ২৩ বছরও পূর্ণ হয়নি। অভিজ্ঞতার ঝুলি শূন্যই বলতে হবে। তারপরও ইতোমধ্যেই এমন ছোট ছোট অনেক ভালোবাসার দেখা পেয়েছি, যেগুলোকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বলাই যায়। এমন সব মানুষের ভালোবাসা, যারা ছিল আমার নিতান্তই স্বল্পপরিচিত বা অপরিচিত৷ কিন্তু তবু তাদের ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না৷


এই যে এখন চারিদিকে তাকালেই শুধু নেতিবাচকতা, স্বার্থপরতা, ঘৃণা আর কাদা ছোঁড়াছুড়ি, সেগুলো যেমন মিথ্যে না, তেমনি এই সত্যিটাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের আশেপাশে অসংখ্য ভালো মানুষেরও বাস, যাদের বুকভর্তি মায়া, মমতা আর ভালোবাসা। অনুভব করার মতো মন থাকলে আমাদের সবার পক্ষেই এই ভালোবাসা উপলব্ধি করা সম্ভব। এবং যদি মনে বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতাবোধ থাকে, তাহলে আমরা এই ভালোবাসা অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে পারি।


দিনশেষে আমাদের প্রধান পরিচয় আমরা মানুষ। তাহলে কী লাভ ঘৃণার চাষাবাদ করে, যেখানে ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীটাকে সত্যের মতো সুন্দর আর পবিত্র করে গড়ে তোলা যায়?


(জান্নাতুল নাঈম পিয়াল এর প্রকাশিত প্রথম বই 'পজিটিভ থটস' এর অংশবিশেষ এটি। আত্ম-উন্নয়নমূলক বইটি ডাউনলোড করে পড়ার অনুরোধ রইল।

Positive Thoughts Pdf | পজিটিভ থটস বই PDF 

পজিটিভ থটস by জান্নাতুল নাঈম পিয়াল



  


0/Post a Comment/Comments

Previous Post Next Post