শিশুশ্রম রচনা - শিশুশ্রম | Shishushorme Rochona

শিশুশ্রম রচনা - শিশুশ্রম | Shishushorme Rochona, শিশুশ্রম বলতে কি বোঝায়, শিশুশ্রম কি, শিশুশ্রম অনুচ্ছেদ রচনা, রচনা - শিশুশ্রম

    শিশুশ্রম রচনা

    ভূমিকা : প্রত্যেক শিশুর মধ্যে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে । তাই সর্বক্ষেত্রেই শিশুর প্রতি সর্বোচ্চ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়ােজন । কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলােতে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বাস্তবিক সমস্যা , এত বেশি যে শিশুর প্রতি আলাদা যত্ন নেয়ার বিষয়টি এখানে উপেক্ষিতই থাকে । জীবনের মৌলিক চাহিদাই এ অঞ্চলগুলােতে সােনার হরিণ হয়ে দেখা দেয় । তাই শিশুদের প্রতি আলাদা কোনাে দৃষ্টি দেওয়া হয় না । যে বয়সে হয়ত তার স্কুলে যাওয়ার কথা ; সে বয়সে সে খাদ্যের জন্য সংগ্রাম করে এবং অর্থ উপার্জনের জন্য শারীরিক পরিশ্রম করে । জাতিসংঘ শিশু সনদ আইনে শিশুর বেঁচে থাকাকে তার জন্মগত অধিকার বলা হয়েছে । কিন্তু তারপরও বাংলাদেশে লঙ্ঘিত হচ্ছে শিশু অধিকার ।

    শিশু অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইন : জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের কম বয়সি প্রত্যেককে শিশু বলা হয়েছে । বাংলাদেশেও ১৮ বছরের কম বয়সি সবাইকে শিশ হিসেবে আখ্যায়িত করা । হয়েছে । জাতিসংঘ প্রণীত শিশু সনদে শিশুর থাকবে : 
    ক , স্নেহ ভালােবাসা ও সমবেদনা পাবার অধিকার ; খ . পুষ্টিকর খাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার অধিকার ; 
    গ , অবৈতনিক শিক্ষার সুযােগ ; 
    ঘ . খেলাধুলা ও আমােদ প্রমােদের পূর্ণ সুযােগ পাওয়ার অধিকার ; 
    ঙ , একটি নাম ও নাগরিকত্বের অধিকার ; 
    চ . পঙ্গু শিশুদের বিশেষ যত্ন ও সেবা শুশ্রুষা পাবার অধিকার ; 
    ছ , দুর্যোগের সময় সবার আগে ত্রাণ পাওয়ার অধিকার ; 
    জ , সমাজের কাজে লাগার উপযােগী হয়ে গড়ে ওঠার ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের অধিকার ; 
    ঝ , শান্তি ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনােভাব নিয়ে গড়ে ওঠার অধিকার । এখানে কোনাে ধারাতেই শিশুশ্রমের কোনাে বিধান নেই । তাই শিশুশ্রম নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিকভাবে মানবতা লষ্মিত হওয়ার মতাে একটি বিষয় । 

    বিভিন্ন দেশে শিশুদের অবস্থান : আন্তর্জাতিকভাবে শিশুদের অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে । উন্নত দেশগুলােতে শিশুদের সর্বোচ্চ অধিকার নিশ্চিত করা হলেও উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলােতে চিত্র খুব একটা সুখকর নয় । সেসব দেশে শিশুর ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা হয় না । বিশ্বের মােট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশই শিশু ; সে কারণে শিশু অধিকারকে ভূলুষ্ঠিত করে সার্বিক উন্নয়ন কোনােভাবেই সম্ভব নয় । সে কারণে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই এখন শিশুর অধিকারের বিষয়ে নানা সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা হচ্ছে । কারণ যাদের ওপর আগামী পৃথিবীর দায়িত্ব বর্তাবে তারাই যদি সবলভাবে বেড়ে উঠতে না পারে তবে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন কোনােভাবেই সম্ভব নয় । 

    বাংলাদেশে শিশুদের অবস্থান : বাংলাদেশে শিশুদের অবস্থাকে স্বস্তিকর বলা যাবে না । কারণ এখানে শিশুদের বাস্তবিক অধিকার খুবই কম । শিশুর প্রতি সহিংসতাও এখানে অনেক বেশি ; শুধু ২০১৫-২০১৬ বছরে প্রায় হাজারের ওপরে শিশু বিভিন্ন কারণে সহিংসতার শিকার হয়েছে । এদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়ােজিত ছিল । শিশুদের জন্য নামসর্বস্ব কিছু প্রতিষ্ঠান হলেও তারা বৃহৎ পরিসরে শিশুদের অধিকার ও তাদের ওপরে হওয়া সহিংসতার কোনাে সমাধান করতে পারছে না । সরকার থেকে শিশুদের জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা সুফল বয়ে আনছে না । শিশুশ্রম দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে । 

    শিশুশ্রমের স্বরূপ : সাধারণত শিশুরা যখন শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে বা অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে শ্রম দিয়ে থাকে তাকেই শিশুশ্রম বলা হয় । সাধারণত পরিবারের প্রয়ােজনেই তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে বাধ্য হয় । বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরাের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী দেশে এ মূহুর্তে ২৫ লক্ষ শিশু শ্রমিক রয়েছে । এছাড়া বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী দেশের মােট শ্রমিকের ১২ শতাংশই শিশু শ্রমিক ; অবশ্য এ হিসেবে কেবল নিবন্ধনকৃত শিল্প প্রতিষ্ঠানের কথাই বলা হয়েছে । এখানে গৃহকর্মে নিয়ােজিত শিশুদের কথা বলা হয়নি : সেটি হিসাব করলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই আমাদের ধারণা । 

    বাংলাদেশে শিশুশ্রমের প্রকারভেদ : অত্যন্ত কষ্টের হলেও সত্য এই যে , বাংলাদেশে শিশু অধিকারকে লজ্জন করে শিশুশ্রমের আধিপত্য লক্ষ করা যায় । জাতীয় শিশুনীতি ২০১০ - এর খসড়ায় ১৪ বছর বয়সিদের সার্বক্ষণিক শ্রমে নিয়ােজিত না রাখার বিধান রাখা হয়েছে । কিন্তু শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে । তাদের শ্রমের কিছু ধরন হলাে : 
    ক , গৃহকর্ম : শিশুশ্রমের প্রথম পর্যায়েই দেখা যায় শিশুরা অন্যের বাড়িতে শ্রমের বিনিময়ে অর্থ ও খাদ্য উপার্জন করছে । সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা নানারকমের গৃহস্থালি কাজ করছে । অনেকসময় কাজ করতে গিয়ে তাদের ত্রুটি হলে গৃহকর্তার হাতে নানাভাবে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে । অনেক সময় নির্যাতনের মাত্রা এত তীব্র হয় যে , তাদের মৃত্যুও বরণ করতে হচ্ছে । অপেক্ষাকৃত ধনী মানুষের সন্তানরা যখন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে , তখন গৃহকর্মে নিয়ােজিত শিশুরা নানাভাবে শ্রম দিচ্ছে । অর্থাৎ সুস্পষ্টভাবেই তারা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে ।
    খ,ওয়ার্কশপ ও গ্যারেজের কাজ ; শিশুরা বিভিন্নভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে । গাড়ি মেরামত , ওয়েলডিং , বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ধােয়ামােছা এবং গ্যারেজের গাড়ি পরিষ্কার করার কাজ করে শিশুরা । অনেক সময় শিশুদের ভারী যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ তৈরির কাজেও সম্পৃক্ত হতে দেখা যাচ্ছে ; যা তাদের জীবন । পর্যন্ত ঝুঁকিতে ফেলছে । 
    গ . ইটভাঙ্গা ও কুলিগিরি : ইটভাঙ্গা ও কুলিগিরির মতাে অমানুষিক পরিশ্রমের কাজেও আমাদের দেশের শিশুরা জড়িত । স্কুলের বই - খাতা ফেলে পরিবারের প্রয়ােজনে তারা নির্মাণ কাজের শ্রমিক হিসেবে ইট ভাঙে অথবা রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডে বােঝা নয় । তারচেয়েও অমানবিক হচ্ছে যেসব মানুষ তাদের এ কাজে নিয়ােজিত করে তারা তাদের সঠিক পারিশ্রমিকও দেয় না । উপরন্তু তাদের নানারকম নির্যাতন সহ্য করতে হয় । 
    ঘ . অফিস - আদালতে খাবার পৌঁছে দেয়া : বিভিন্ন অফিস কর্মচারীদের জন্য শিশুরা মাথায় করে খাবার পৌছে দেয় । প্রায় সারাদিন শিশুদের একটি দল এ কাজে নিয়ােজিত থাকে । তারা পায়ে হেঁটে বিভিন্ন অফিসে খাবার পৌছে দেয় । এ কাজের জন্য তারা যে বেতন পায় তা অতিসামান্য । 
    ঙ . শহরের ময়লা - আবর্জনা পরিষ্কার করা : পৌরসভা বা সিটি করপােরেশন থেকে যে ময়লার গাড়িগুলাে শহর প্রদক্ষিণ করে সেখানে শ্রমিক হিসেবে শিশুরা কাজ করে । প্রতিটি বাসা থেকে বা নির্দিষ্ট ডাস্টবিন । থেকে শিশুরা ময়লা তুলে গাড়ি ভরাট করে । এতে তারা নানারােগে আক্রান্ত হয় । 

    শিশুশ্রমের প্রতিকার : শিশুশ্রমের প্রতিকারের জন্য প্রথমেই প্রয়ােজন সদিচ্ছা । কারণ অর্থনৈতিক শ্রেণিবৈষম্যের এ দেশে নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়ে ওঠে অধিকার বঞ্চিত শিশুরা । তারা বিভিন্নভাবে অমানবিক ব্যবহার সহ্য করে ও অবহেলার শিকার হয় । তাদের প্রতি সর্তক দৃষ্টি না থাকার ফলে তারা না । বুঝেই অনেকক্ষেত্রে বিপথে পা বাড়ায় । এক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি এগিয়ে আসেন তবে খুব সহজেই শিশুশ্রমের প্রতিকার করা যায় । মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ইতােমধ্যে সমস্ত বিশ্বের অধিকার বঞ্চিত শিশুদের জন্য বিশেষ তহবিল ঘােষণা করেছে । ইউনিসেফ ও সেভ দ্যা চিলেড্রেনও শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ শিশু অধিকার আইনকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন । ১৯৫৪ সাল থেকে জাতিসংঘ বিশ্ব শিশুদিবস পালন করছে । প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সােমবার ‘ বিশ্ব শিশুদিবস ' পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় । শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তােলা , তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই এ দিবসের প্রতিপাদ্য । শিশুদের কল্যাণ সাধন ও বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য । বিগত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর কয়েকটি দেশে ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে বহু শিশু হতাহত হয়েছে । আবার এসব দেশ থেকে পালিয়ে অবৈধভাবে ইউরােপের দেশগুলােতে যাওয়ার পথেও বহু শিশু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে । যারা বেঁচে যাচ্ছে , তারাও মানবেতর জীবনযাপন করছে । নানা ধরনের শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের টিকে থাকতে হচ্ছে । সুতরাং বিশ্বজনমত এক হয়ে শিশুদের বিষয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনই শিশুর জীবন ও শিশুশ্রম নিরসনে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়ােজন । 

    উপসংহার : আমাদের দেশে শিশু শ্রম বিলােপ ও শিশু অধিকার নিশ্চিত করতে দারিদ্র্য দূর করা অত্যাবশ্যক । এছাড়া শিশু সম্পর্কে মানুষের নানা কুসংস্কারও দূর করতে হবে । যে শিশু আগামীর নাগরিক সে যদি অরক্ষিত থাকে তবে সমস্ত সমাজই বিপন্ন হয়ে পড়বে । শিশুদের হাতেই রয়েছে আগামী বাংলাদেশের সম্ভাবনার চাবিকাঠি , তাই তাদের গড়ে তুলতে হবে আমাদেরকেই । আজকের শিশু হবে আগামীর দেশ গড়ার সৈনিক । শিশুকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে গড়ে তুলতে পারলেই সার্থক হবে বাংলাদেশ ।

    শিশুশ্রম বলতে কি বোঝায়

    Shishushorme Rochona


    Tag: শিশুশ্রম রচনা - শিশুশ্রম | Shishushorme Rochona, শিশুশ্রম বলতে কি বোঝায়, শিশুশ্রম কি, শিশুশ্রম অনুচ্ছেদ রচনা, রচনা - শিশুশ্রম 
    Previous Post Next Post

    👇 সকল ক্লাসের এসাইনমেন্ট নোটিফিকেশন আকারে সহজে পেতে ডাউনলোড করুন আমাদের এপ্লিকেশন 

    আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত হতে ক্লিক করুন