বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা রচনা - বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা | Borshonmukhor Akti Sondha

 

বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা রচনা - বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা, Borshonmukhor Akti Sondha,  বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা অনুচ্ছেদ রচনা, বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা

    বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা রচনা

    কিছু কিছু মুহূর্তের আবেদন মানুষের জীবনে গভীরতর । স্মৃতির পাতায় তা আঁকা পরম যত্নে । সেদিনের বর্ষণমুখর সন্ধ্যাও আমার হৃদয়পটে দাগ কেটেছে । প্রবল বর্ষণে মুখরিত সে সন্ধ্যা আপন স্বাতন্ত্র্য আর বৈচিত্র্য নিয়ে আমার মনকে করে তুলেছিল ব্যাকুল । প্রকৃতির বুকে বর্ষা এসেছে অনেক আগেই । বৃষ্টির অঝাের ধারায় প্রকৃতি তার তৃষ্ণা মিটিয়েছে কানায় কানায় । বরং কখনাে কখনাে অতিবর্ষণে জনজীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত । মােটকথা , আকাশের বুকে কালাে মেঘ আর বৃষ্টি এখনকার অতি পরিচিত রূপ । তবুও শ্রাবণের সেই সন্ধ্যাটি অন্যরকম একটা শিহরণ নিয়ে আমার অনুভূতিতে সাড়া জাগিয়েছে । 

    দুদিন হয়েছে বন্ধুর সাথে তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি । সেই থেকে অধীর হয়ে আছি কখন টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনব । শহরে , বৃষ্টি দেখেছি । কিন্তু শহরের প্রকৃতি গ্রামের প্রকৃতির মতাে অত নিবিড়ভাবে মনকে স্পর্শ করে না । তাই বিছানায় শুয়ে টিনের চালে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ শুনব— এ ছিল আমার অনেকদিনের স্বপ্ন । এতদিনের ব্যাকুলতা যেন সেই সন্ধ্যায় এসে ঘুচল । সকাল থেকেই আকাশে মেঘের শ্যামরূপ দেখা যাচ্ছিল । কিছুক্ষণ পরপর বৃষ্টিও পড়ছিল । কিন্তু বন্ধুর মায়ের নিষেধে ঘরের বাইরে যাইনি । ঘরে বসেই আমরা আডডা দিয়েছি দুপুর পর্যন্ত । দুপুরে খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । 

    একসময় ঘুম ভাঙল বৃষ্টির শব্দে । ঘড়িতে দেখলাম ঘড়ির কাঁটা পাঁচটার ঘর সবেমাত্র পার করেছে । ঘন মেঘের কারণে সেই সন্ধ্যাটা একটু আগেই নেমেছিল । জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম । দেখলাম । বাতাসের তেজ তেমন নেই , কিন্তু বৃষ্টির ৫৩৫ জোর আছে প্রচণ্ড । শুয়ে শুয়েই আমার কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিকে উপলব্ধি করলাম কিছুক্ষণ । ছােটবেলায় পড়া একটা ছড়ার কয়েকটি লাইন । মনে পড়ল । আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা বাতাস জুড়ে বৃষ্টি , গাছের পাতা কাপছে আহা দেখতে কী যে মিষ্টি । ক্রমেই বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগল । হঠাৎ খােলা জানালা দিয়ে জলের ঝাপটা এসে আমার চোখেমুখে পড়ল ।

    মনে হলাে বৃষ্টি যেন আমায় ডাকছে তাকে ছুঁয়ে দেখার জন্যে । তার কাছে যাওয়ার জন্যে । ব্যস , বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম । শ্রাবণের এ বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় একটা অপার্থিব দৃশ্য আমার চোখে ধরা পড়ল । সান্ধ্য আকাশের তারা ঢেকে গিয়েছে মেঘে । বৃষ্টির ছোঁয়ায় গাছের পাতায় লেগেছে কাপন ; আর নিস্তব্ধ হয়ে আছে চারদিক । এর সাথে ভিন্নমাত্রা যােগ করছে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ । এমন পরিস্থিতিতে বৃষ্টির ছন্দে আমার মন হয়ে উঠল চল । এমন অনুভূতি নিয়েই মনে হয় কবিগুরু লিখেছিলেন ‘ আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল , গেল রে দিন বয়ে । 

    বাঁধন হারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে ॥ একলা বসে ঘরের কোণে কী ভাবি যে আপন মনে , সজল হাওয়া যুথীর বনে কী কথা যায় কয়ে । বর্ষাকে নিয়ে অনেক ছড়া , কবিতা , গান লেখা হয়েছে । তার অনেকগুলাে আমার পড়া ছিল । সেসব ছড়া , কবিতা , গান মনের কোণায় ভিড় জমিয়েছে । কিন্তু বৃষ্টির রিনিঝিনি ছন্দে পাগল মন যেন কিছুতেই ভাষায় তা প্রকাশ করতে পারছে না । একবার এক নাটকে দেখেছিলাম বর্ষায় কদম ফুলের সৌন্দর্য দেখার জন্যে বাবার কাছে ছেলের বায়না ধরার দৃশ্য । সেদিন সেই মুহূর্তে খুব ইচ্ছে করেছিল কদম ফুলে ছেয়ে যাওয়া একটা গাছ দেখতে । পাশের ঘর থেকে সংগীতের মৃদু সুর ভেসে আসছিল । বুঝলাম কেউ রবীন্দ্রসংগীত শুনছেন । 

    বৃষ্টির সুরের সাথে ভেসে আসা গানের মৃদু সুর একাকার হয়ে এক অনির্বচনীয় আনন্দে মনকে ভরিয়ে দিল । মনে হলাে , একটা বাঁধনহারা পাগল আমার ভেতরে ভর করেছে । যে কিনা বৃষ্টির তালে তালে নৃত্য করার জন্যে ব্যাকুল । হঠাৎ প্রচণ্ড বাজের শব্দ । ইলেকট্রিসিটি চলে গিয়ে সে সুরকে স্তব্ধ করে দিল । শুধু শােনা গেল বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ । ইচ্ছে হলাে সবাইকে সাথে নিয়ে এ সুন্দরকে উপভােগ করি । কিন্তু একটা মুহূর্তের জন্যেও সেখান থেকে নড়তে মন চাইল না । বৃষ্টির তালে আমার মন অসম্ভব রকমের অস্থির হয়ে উঠল । কেবলই বাইরের পুলক লাগা প্রকৃতি আমায় টানতে লাগল । প্রবল ইচ্ছে হলাে বৃষ্টিতে ভিজি । বারান্দা থেকে হাত দুটো বাড়িয়ে দিলাম সামনে । বৃষ্টির স্পর্শ পেয়েই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলাে । এমন সময় বন্ধু আসল মগ ভর্তি চা নিয়ে । একটু ঠাণ্ডা লাগছিল । তাই চায়ের মগ দেখেই ভালাে লাগল । আরও ভালাে লাগল হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিকে স্পর্শ করতে পরে । 

    রবীন্দ্রনাথের কবিতা আওড়ে মন বলে উঠল বৃষ্টি নেশা - ভরা সন্ধ্যাবেলা কোনাে বলরামের আমি চেলা আমার স্বপ্ন ঘিরে নাচে মাতাল জুটে ।হঠাৎ হৈ হৈ করে বন্ধুর চাচাতাে ভাই - বােনরা এসে বারান্দায় হাজির হলাে । সবাই মিলে গল্পের আসর বসে গেল । ভালাে লাগল খুব । হঠাৎ আমার দৃষ্টি গেল উঠোনের দিকে । সেখানে পানি জমে গেছে । উঠোনের এক কোণের শিউলি ফুলের গাছটাও কেমন যেন চুপসে গেছে । দেখে হঠাৎ ভেতরটা কেমন যেন মুষড়ে উঠল । গল্পের আসর থেকে আমি যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম । মনে পড়ে গেল , এক বছর আগের বর্ষার একটা দিনের কথা । সেদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছিল প্রবল বৃষ্টি । শহরে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুব ভালাে না হওয়ায় প্রবল বৃষ্টিতে প্লাবিত হলাে পুরাে শহর । আমাদের বাসার পাশে ছিল বস্তি । উপচেপড়া পানির ভিড়ে কাঁচাঘর ভেঙে কয়েকজন মানুষ সেদিন মারা গিয়েছিল । 

    জিনিসপত্র সব ভেসে গিয়েছিল পানির ঢেউয়ের সাথে । পুরাে বস্তিজুড়ে উঠেছিল । কান্নার রােল । পরের দিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল অনেক জায়গায় পাহাড় ধসে বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ার খবর । মৃত্যুর খবর । সেদিনের বৃষ্টিতে অনেক মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে গিয়েছিল । অজানা একটা ভয়ে হঠাৎ আমার মনটা । কুঁকড়ে গেল । না জানি , আজ এ শ্রাবণ সন্ধ্যার প্রবল বৃষ্টিতে কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ? এমন সময় হঠাৎ চোখে পড়ল , উঠোনের এককোণে বৃষ্টিতে চুপসে যাওয়া একটি কাক । প্রতিদিনের সন্ধ্যার মতাে হয়ত কাকটি নীড়ে ফিরছিল । কিন্তু বৃষ্টি হয়ত তার সে নীড়কে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে । দেখে মায়া হলাে খুব । একদিকে প্রচণ্ড ভালাে লাগায় হৃদয় মুখরিত । অন্যদিকে ক্ষতির আশঙ্কায় মন বিষন্ন হয়ে পড়ল । মনটা বেহিসেবি রকমের এলােমেলাে হয়ে গেল । কোনাে কিছুতেই সে স্থির হতে পারছে না । আনন্দমুখর চল মন ক্রমেই উদাস হয়ে গেল । 

    বন্ধুর মার ডাকে ঘাের কাটল । তিনি সবাইকে ঘরের ভেতরে যাওয়ার জন্যে ডাকছেন । সন্ধ্যারানি বিদায় নিয়ে কখন যে রাতের গহ্বরে প্রবেশ করেছে টেরই পাইনি । বৃষ্টির তেজও কমে এসেছে । আকাশের ঘন মেঘ ফিকে হয়ে এসেছে । আকাশকন্যা অবিরল কান্নায় ক্লান্ত , পরিশ্রান্ত । একসময় মেঘ বিদায় নিয়ে সেখানে চাঁদের আলাে দেখা দিল । এখনকার আকাশ দেখে বােঝাই যাবে না সন্ধ্যায় আকাশের কী রূপ ছিল । গ্রামীণ পরিবেশ , তাই বৃষ্টি থেমে গেলেও কর্মচঞ্চলতা দেখা গেল না । 

    প্রকৃতি নিস্তব্ধ হয়েই রইল । সেদিন সন্ধ্যায় কিছু সময়ের জন্যে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে পেরে খুব ভালাে লেগেছিল । মনে হয়েছিল , সেই বর্ষণমুখর সন্ধ্যা আমার পরম প্রাপ্তি । ঘরের ভেতর যেতে যেতে মনের ভেতর অজান্তেই বেজে উঠেছিল । হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে , ময়ূরের মতাে নাচে রে , হৃদয় নাচে রে ।

    বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা


    Borshonmukhor Akti Sondha


    Tag: বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা রচনা - বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা, Borshonmukhor Akti Sondha, 
    বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা অনুচ্ছেদ রচনা, বর্ষণমুখর একটি সন্ধ্যা 
    Previous Post Next Post


    TOP POST

     

     

    🔽 এস এস সি/দাখিল ১ম সপ্তাহের এসাইনমেন্ট ২০২২ সমাধান দেখতে ক্লিক করুন

    🔽 এইচ এস সি/আলিম ১ম সপ্তাহের এসাইনমেন্ট সমাধান ২০২২ দেখতে ক্লিক করুন

    🔽 সকল সপ্তাহের এসাইনমেন্ট সমাধান (ষষ্ঠ-নবম শ্রেণীর) দেখতে ক্লিক করুন 

    ☀️আপনার নামের অর্থ জানতে ক্লিক করুন 

    ��এসএসসি সকল বই ও নোট ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন